কাস্টমসের চাকরি মানেই ‘আলাদিনের চেরাগ। ১২ বছরে শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে রাজস্ব কর্মকর্তা আলতাফ। ফাইল ছবি
কাস্টমসের চাকরি যেন ‘আলাদিনের চেরাগ’—এমন মন্তব্য দীর্ঘদিন ধরেই লোকমুখে প্রচলিত। আর সেই আলোচনাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ। কাস্টমসের চাকরি মানেই অঢেল সম্পদের মালিক বনে যাওয়া—এমন প্রচলিত ধারণাকে যেন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনের ঘটনা তুঙ্গে। মাত্র এক যুগের চাকরি জীবনে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়া, গ্রামে রাজপ্রাসাদসদৃশ বাড়ি নির্মাণ, রাজধানীতে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট কেনা, দামি গাড়ি ব্যবহার এবং স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কাস্টমস ও ভ্যাটের ১৪তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা ২০১৪ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন তিনি এবং একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে কর্মরত অবস্থায়, বিশেষ করে তৎকালীন মহাপরিচালক ড. শহিদুল ইসলামের সময়ে, আলতাফ হোসেন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সময় তিনি শীর্ষ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এবং ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন।
আরও জানা যায়, শুল্ক গোয়েন্দার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইট ইউনিটে তিনি এক বছরেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন। অথচ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ওই দপ্তরের একটি পদে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য পদায়নের বিধান রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই সময়েই তিনি কয়েক কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলেন।
বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ফুলহাতা গ্রামের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন নিজ এলাকায় “টাকার কুমির” নামে পরিচিত বলেও স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, পৈতৃক নিবাস বাগেরহাট হলেও তিনি সরকারি চাকরিতে মুন্সীগঞ্জ কোটার সুবিধা নিয়েছেন। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তদন্ত করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার চাকরি জীবনের মোট বেতন যেখানে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে আলতাফ হোসেনের নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। বর্তমানে দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার সর্বসাকুল্যে মাসিক বেতন ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকা।
সম্প্রতি এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনেও আলতাফ হোসেনের ভূমিকা ছিল আলোচিত। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে চাপে ফেলতে তিনি ও তার সিন্ডিকেট আন্দোলনে কোটি টাকা ব্যয় করেছেন এবং সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, এনবিআরের এক সাবেক প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সুপারিশে আলতাফ হোসেনের চাকরি হয়। পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে তিনি এনবিআরে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেন এবং দুর্নীতির একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
চাকরি জীবনে তিনি কিশোরগঞ্জ, খুলনা, শুল্ক গোয়েন্দা ও বর্তমানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালন করেছেন। চট্টগ্রামে কর্মরত অবস্থায় ব্যবসায়ী ও সিএন্ডএফ এজেন্টদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ ছাড়া কোনো ফাইল ছাড়েন না এবং বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন—এমন অভিযোগও উঠে এসেছে। সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের নতুন কমিশনার তাকে বদলি করেছেন বলেও জানা গেছে। সেই বদলি ঠেকাতে এনবিআরে তদবির চালানোর অভিযোগও রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ঢাকার যাত্রাবাড়ীর দনিয়ার ৩০০/১, পূর্ব রসুলপুর এলাকায় তার একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া রসুলপুরের মাস্টারবাড়িতে নির্মাণাধীন ১১ তলা ভবনের নবম তলায় আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। স্ত্রী ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের নামেও বিভিন্ন স্থানে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং ফিক্সড ডিপোজিট থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য
দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে ফোনে যোগাযোগ করা হলে রাজস্ব কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন বলেন, “আমার দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে, তাতে আপনার সমস্যা কোথায়? আমার আরও সম্পদ আছে। দুদক ডাকলে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করবো। এনবিআরকে টাকা দিয়ে কিনবো। লাগলে সবাইকে টাকা দিয়ে কিনবো। এনবিআরের সব কর্মকর্তা দুর্নীতিবাজ। আমি দুর্নীতি করলে সমস্যা কোথায়?”
উল্লেখ্য যে , প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
এ অভিযোগের আপডেট তথ্য ও ব্যাখা পেলে বিস্তারিত থাকবে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…………..
