ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ (ফাইল ফটো)
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক পদে নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে মুখ খুলেছেন দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। তিনি বলেছেন, যদি বিধিবহির্ভূত হওয়ার কারণে আমার নিয়োগ বাতিল করা হয়, তাহলে যে প্রশাসন আমাকে নিয়োগ দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বিএমইউ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী হয়নি। এ বিষয়ে সমকালকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, আমি নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। বর্তমানে একটি বই লিখছি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া কক্ষে বসেই সেই কাজ করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।
এর আগে শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামালের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ডা. আব্দুল্লাহর নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়নি। বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ বি এম আব্দুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টির পটভূমি তুলে ধরেছে। নথিপত্র পর্যালোচনায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক, প্রক্রিয়াগত ও আর্থিক বিভিন্ন প্রশ্ন উঠে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ৬৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ ও ৮৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এ বি এম আব্দুল্লাহকে তিন বছরের জন্য ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় তাঁকে মাসিক ৩০ হাজার টাকা সম্মানী, চিকিৎসা সুবিধা এবং সীমিত প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়া হতো। নির্ধারিত মেয়াদের ওই নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনের কোনো আপত্তি ছিল না বলেও জানানো হয়।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগে ২০২৪ সালের ২০ জুন অনুষ্ঠিত ৯২তম সিন্ডিকেট সভায় ‘ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ অধ্যাদেশ’ সংশোধন করে আজীবন নিয়োগের বিধান যুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধাও বাড়ানো হয়। এতে ডা. আব্দুল্লাহর জন্য অবসরের সময়কার অধ্যাপকের বেতন-ভাতার সমপরিমাণ মাসিক সম্মানী, আজীবন চিকিৎসা সুবিধা, অফিস, জনবলসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করা হয়।
বিএমইউর বিবৃতিতে বলা হয়, বাজেট অধিবেশনের মূল এজেন্ডার বাইরে এমন প্রস্তাব আনা ছিল নজিরবিহীন এবং বিধিবহির্ভূত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে, এর মাধ্যমে একজনকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। এ খাতে তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি অর্থ গ্রহণ করেছেন বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের প্রস্তাব, ডিনের মাধ্যমে উপাচার্যের কাছে উপস্থাপন এবং মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশসহ নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু ডা. আব্দুল্লাহর ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। শুধু একজন সদস্যের প্রস্তাবের ভিত্তিতে তাঁকে আজীবন নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযোগ, গত প্রায় দুই বছরে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত হননি এবং শিক্ষাদান বা গবেষণা-সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পর্কেও প্রশাসনকে অবহিত করেননি। তবে এ সময়ে তিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন।
বর্তমান প্রশাসনের ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগের নজির থাকলেও আজীবন পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতনের সমপরিমাণ সুবিধা দেওয়ার কোনো নজির পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, গত ১৩ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি পর্যালোচনা করে ২০২৪ সালের ২৪ জুনের আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগকে বিধিবহির্ভূত বিবেচনায় বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকীর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
উল্লেখ্য, চিকিৎসাখাতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ ২০১৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া তিনি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেছেন। করোনাভাইরাস মহামারির সময় জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি ‘কোভিড হিরো’ পুরস্কার অর্জন করেন।
তাঁর রচিত ‘শর্ট কেইস অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’ বইটির জন্য ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পুরস্কার লাভ করেন। চিকিৎসাশিক্ষা বিষয়ে তাঁর লেখা মোট ১০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তিনটি বই দেশের মেডিকেল শিক্ষায় পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
