শুক্রবার, ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আয়কর নথি জালিয়াতির অভিযোগে সহকারী কর কমিশনার মিতুর পদোন্নতি ৮ বছর স্থগিত

স্টাফ রিপোর্টার
সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬ ৭:০২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

৩৮ লাখ টাকা গ্রহণ ও স্পর্শকাতর কর নথি হস্তান্তরের অভিযোগ—বিভাগীয় তদন্তে ‘অসদাচরণ’ প্রমাণিত, সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার। ফাইল ছবি

আয়কর নথির মূল রেকর্ড পরিবর্তন, নতুন নথি সংযোজন এবং গুরুত্বপূর্ণ কর নথি আইনজীবীর কাছে হস্তান্তরের গুরুতর অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহকারী কর কমিশনার মিজ জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুর পদোন্নতি আগামী ৮ বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

তবে বিভাগীয় তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ‘দুর্নীতিপরায়ণ’-এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তদন্ত ও সার্বিক বিষয় বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ তাঁকে অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে এই লঘুদণ্ড দিয়েছে।

গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ (১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের কর-১ শাখা থেকে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

মূল আয়কর নথি পরিবর্তনের অভিযোগ

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, মিজ জান্নাতুল ফেরদৌস মিতু (আইডি: ২০০৬৯৭) কর অঞ্চল-৫-এর সার্কেল-৯৩-এ সহকারী কর কমিশনার হিসেবে কর্মরত থাকাকালে করদাতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের (টিআইএন: ৪৮৩৩৮৪২২৩৯১৯) আয়কর নথির মূল রেকর্ডপত্র পরিবর্তন করে নতুন রেকর্ড সংযোজন করেন—এমন অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এর বিনিময়ে তিনি ওই করদাতার মনোনীত প্রতিনিধি আয়কর আইনজীবী মো. ওবায়দুল হক সরকার ও তাঁর সহকারী সোহেলের কাছ থেকে নগদ ৩৮ লাখ টাকা গ্রহণ করেন।

এ ছাড়া পুরোনো আয়কর রিটার্ন, অর্ডার শিট, কর নির্ধারণী আদেশ এবং আপীল-ট্রাইব্যুনাল আদেশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মূল নথি আইনজীবীদের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগও উঠে আসে।

২০১৬ সালেই বিভাগীয় মামলা

এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে বিভাগীয় মামলা নং-০১/২০১৬ রুজু করা হয়। একই বছরের ১৮ মার্চ তাঁর ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

তদন্তে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী আনীত ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হলেও বিধি ৩(ঘ) অনুযায়ী আনীত ‘দুর্নীতিপরায়ণ’-এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন ও সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে মিতুকে ‘অসদাচরণ’-এর দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। শাস্তি হিসেবে তাঁর ৮ বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত রাখার লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

একই সঙ্গে মিজ জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুর সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব আহসান হাবিব।

২৩৭ কোটি টাকার আয় নিয়ে করফাঁকির অভিযোগ

মিতুকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পেছনে রয়েছে আরও বড় করফাঁকির অভিযোগ। উল্লেখ্য, এসএ গ্রুপের কর্ণধার ও এসএ পরিবহনের মালিক সালাহ উদ্দিন আহমেদ ১২ করবর্ষের কর ফাইল সম্পূর্ণ করে সাজিয়ে ২৩৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকার আয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের করফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১ কোটি টাকার ঘুষ চুক্তি করেছিলেন—এমন অভিযোগ তখন সামনে আসে।

অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর আয়কর আইনজীবী ওবায়দুল হক সরকার চুক্তির পর জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুকে ঘুষের প্রথম কিস্তি হিসেবে ৩৮ লাখ টাকা প্রদান করেন। এর বিনিময়ে মিতু ১২ করবর্ষের আয়কর রিটার্নসহ গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর নথি ওবায়দুল হকের হাতে তুলে দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

তবে বিভাগীয় তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে ‘দুর্নীতিপরায়ণ’-এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি—এ বিষয়টিও সরকারি প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

২০২৫ সালে সাময়িক বরখাস্ত

এর আগে এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তৎকালীন সচিব মো. আবদুর রহমান খানের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে সহকারী কর কমিশনার জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

ওই সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, কর অঞ্চল-৫, ঢাকায় কর্মরত সহকারী কর কমিশনার জান্নাতুল ফেরদৌস মিতু বিপুল অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে করদাতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের মনোনীত প্রতিনিধি আয়কর আইনজীবীকে গুরুত্বপূর্ণ আয়কর নথিপত্র সরবরাহ করেন।

এসব নথির মধ্যে পূর্ববর্তী কর রিটার্ন, অর্ডার শিট, কর নির্ধারণী আদেশ, আপিল ও ট্রাইব্যুনাল আদেশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন নথি ছিল বলে তখন প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি-১২ অনুযায়ী তাঁকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। ঘটনাটি তখন গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

প্রশ্ন এখন শাস্তির কার্যকারিতা নিয়ে

আয়কর নথির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল সরকারি রেকর্ডের পরিবর্তন ও হস্তান্তরের অভিযোগে একজন কর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ প্রমাণিত হয়ে ৮ বছরের পদোন্নতি স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করেছে।

তবে একই ঘটনায় ‘দুর্নীতিপরায়ণ’ হওয়ার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় বিষয়টির আইনগত ও প্রশাসনিক দিক নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, করদাতাদের গোপনীয় নথি সংরক্ষণ, পরিবর্তন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি নথি নিয়ে এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত, শাস্তি ও নথি ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
নগর-মহানগর সর্বশেষ