তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিলবোর্ডের সামনে ইরানের পতাকা। মঙ্গলবার ভালিয়াসর স্কয়ারে। ছবি: এএফপি
যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধের লক্ষ্যে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি দল কাতারে অবস্থান করছে। ঠিক এমন সময়ে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, ইরানি বাহিনীর হুমকি থেকে সেনাদের রক্ষা করতে ওই ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালানো হয়।
তবে সেন্টকম সোমবারের হামলাটির বিস্তারিত বিবরণ ও সুনির্দিষ্ট স্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয়নি। অন্যদিকে, ইরানি গণমাধ্যমগুলো দক্ষিণ ইরানে হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের বন্দর আব্বাসে বেশ কিছু বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা এবং যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে যখন ইতিবাচক আশা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই হামলার ঘটনা ঘটল। এই হামলার আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকা সমস্যার বড় অংশ সমাধান হয়ে গেছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি এখনই হচ্ছে না।
হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে?
সেন্টকম-এর মুখপাত্র ও নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স সোমবার গভীর রাতে আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং মাইন স্থাপনের চেষ্টায় নিয়োজিত ইরানি স্পিডবোটগুলো ছিল।
ভারত সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একই তথ্য জানিয়েছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি যেভাবেই হোক উন্মুক্ত রাখতে হবে। কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।
অপরদিকে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবেই চলছে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে আরও হামলার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ইরান হামলার বিষয়ে কী বলেছে?
ইরানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে দেশটির বার্তা সংস্থাগুলো সোমবার জানিয়েছে, একটি নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে খুব দ্রুতই কোনো বড় সাফল্য বা চুক্তি হতে যাচ্ছে- এমনটা বলা যাবে না। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, এই মুহূর্তে উভয়পক্ষ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা করছে না। বরং তাদের মূল মনোযোগ যুদ্ধ অবসানের ওপর।
কূটনৈতিক অঙ্গনে কী ঘটছে?
মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ চারদিনের সফরে চীনে আছেন। সেখানে তিনি ও সেনাপ্রধান অসিম মুনির চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ইরানকে রাজি করাতে ট্রাম্প প্রশাসন কয়েক সপ্তাহ ধরে বেইজিংকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য চাপ দিচ্ছিল। যদিও শির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের আগে ওয়াশিংটন জানায়, তাদের আসলে বেইজিংয়ের সহায়তার প্রয়োজন নেই।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ একটি প্রতিনিধি দল বর্তমানে কাতারে অবস্থান করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই শান্তি আলোচনাকে আরেকটি মাত্রা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর চাওয়া, সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তান যেন ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ স্বাক্ষর করে। দেশগুলো আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষরের অর্থ হলো- এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে।
২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদানের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হয়েছিল। তবে আরব দেশগুলো বরাবরই বলে আসছে, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান নীতির মাধ্যমে সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পরই তারা ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে।
আলোচনার মধ্যেই হামলার অর্থ কী?
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক অ্যালান ফিশার জানিয়েছেন, সোমবারের হামলার ঘটনা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে চলমান আলোচনাকে লাইনচ্যুত বা বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
ফিশার বলেন, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার ঠিক পরপরই এ ধরনের বেশ কয়েকটি ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি এগুলোকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে মনে করেন না।
অ্যালান ফিশার বলেন, ‘মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে খুবই সীমিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এই অভিযানের ব্যাপ্তি ঠিক কতখানি তা জানা যাচ্ছে না। তাই এই হামলাটি অন্যবারের চেয়ে ব্যতিক্রমী কি না, তা বলা মুশকিল।
