ফাইল ছবি
শুল্ক ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে আসছে ভারতীয় ওষুধ, কসমেটিকস, মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ ও মদ। অভিযান চালিয়ে এসব চোরাই পণ্য নিয়মিত জব্দ করছে বিজিবি। কখনও মুড়ির বস্তায়, কখনও ডোবার পানিতে পুঁতে রাখা অবস্থায় মিলছে মদের চালান। কিন্তু বারবার বিপুল পরিমাণ পণ্য ধরা পড়লেও অধরাই থেকে যাচ্ছে চোরাচালান চক্রের মূলহোতারা।
গারো পাহাড়ের সীমান্তজুড়ে কিছুতেই থামছে না চোরাচালান। প্রতি মাসেই শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য বিজিবির অভিযানে জব্দ হচ্ছে। তবে পণ্য জব্দের পরিমাণ যতই বাড়ছে, ততই সামনে আসছে একটি প্রশ্ন—চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়ালরা কোথায়?
স্থানীয় লোকজন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গত দুই-আড়াই বছরে শতকোটি টাকা মূল্যের চোরাই পণ্য ধরা পড়েছে। অথচ এসব চালানের সঙ্গে জড়িত বড় কারবারিরা কেন ধরা পড়ছে না? তাদের দাবি, মূলহোতারা গ্রেপ্তার হলে চোরাচালানের এতটা বিস্তার কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।
পণ্য আসে সীমান্ত পেরিয়ে, ধরা পড়ে ফেলে যাওয়া চালান
গারো পাহাড়ের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চোরাচালান চক্র এই অবৈধ ব্যবসায় বিপুল পরিমাণ মূলধন বিনিয়োগ করেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে দীর্ঘদিন ধরে তারা চোরাচালান চালিয়ে যাচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
অস্বাভাবিক মুনাফার কারণে কোটি টাকার পণ্য ধরা পড়লেও চোরাচালানিরা তেমন তোয়াক্কা করে না। সীমিত জনবল নিয়ে বিজিবি এককভাবে চোরাচালান ঠেকাতে চেষ্টা করছে। তবে অভিযানের সময় বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা মালপত্র ফেলে পালিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে তারা।
আগস্টেই প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকার পণ্য জব্দ
বিজিবি সূত্র জানায়, গত আগস্ট মাসেই সীমান্তের ওপার থেকে গারো পাহাড় দিয়ে আনা প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২৯ আগস্ট পৃথক অভিযানে ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের গুরুচরণ দুধনই এবং নালিতাবাড়ীর পোড়াবাড়ি এলাকা থেকে সাড়ে ১০ লাখ টাকা মূল্যের ৭০৫ বোতল ভারতীয় মদ জব্দ করেন বিজিবি সদস্যরা। এর মধ্যে শতাধিক বোতল মদ তিনটি বস্তায় ভরে একটি জলাশয়ে পুঁতে রাখা হয়েছিল।
এর আগে ৬ আগস্ট নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের পানিহাতা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৮১ লাখ ২০ হাজার ৮০০ টাকা মূল্যের ভারতীয় ওষুধ জব্দ করা হয়।
মোবাইলের ডিসপ্লে, কসমেটিকস—সবই আসছে সীমান্তপথে
পাশের এলাকা হালুয়াঘাট উপজেলার বান্দরকাটা থেকে ২৭ আগস্ট অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনের বিপুল পরিমাণ ডিসপ্লে জব্দ করা হয়। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা এসব পণ্য ফেলে পালিয়ে যায়। জব্দ করা ডিসপ্লেগুলোর মূল্য ৪৮ লাখ ৫১ হাজার টাকা বলে জানিয়েছে বিজিবি।
এদিকে ১১ আগস্ট ভোরে শ্রীবরদী উপজেলার সিঙ্গাবরুনা ইউনিয়নের গারো পাহাড়ের গহিন জঙ্গল চান্দাপাড়া এলাকায় অভিযান চালায় বিজিবির টহল দল। এ সময় চোরাকারবারিরা কসমেটিকস ও গরু ফেলে পালিয়ে যায়। উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকা মূল্যের প্রসাধন সামগ্রী এবং প্রায় ৩ লাখ টাকা মূল্যের চারটি গরু।
একই এলাকায় ১৮ আগস্ট আরও সাড়ে ৮ লাখ টাকা মূল্যের কসমেটিকস উদ্ধার করা হয়।
পাঁচমেঘাদলেও একই চিত্র
সিঙ্গাবরুনা ইউনিয়নের পাঁচমেঘাদল দিয়ে ১৪ আগস্ট ভারতীয় কসমেটিকস বাংলাদেশে পাচারের চেষ্টা করে চোরাকারবারিরা। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে মালপত্র ফেলে পালিয়ে যায় চক্রটি। এ সময় নামিদামি ব্র্যান্ডের ১৮ লাখ ২ হাজার টাকা মূল্যের কসমেটিকস উদ্ধার করা হয়।
একই দিনে নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও স্থলবন্দরে বিশেষ অভিযান চালিয়ে আড়াই লাখ টাকা মূল্যের ১৬৯ বোতল মদ উদ্ধার করে বিজিবি।
এরপর ১৬ আগস্ট শ্রীবরদী সীমান্তের বৈষ্ণবপাড়া থেকে আরও ১৫৩ বোতল মদ জব্দ করা হয়। এসব মদের মূল্য ২ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এ ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে শ্রীবরদী থানায় মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
আবারও কসমেটিকসসহ ইজিবাইক জব্দ
গত বুধবার বিজিবির টহল দল কর্ণঝোড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভারতীয় বিভিন্ন ধরনের কসমেটিকস ও একটি ইজিবাইক জব্দ করে। জব্দ করা মালামালের মোট মূল্য ১১ লাখ ৪০ হাজার ৩০০ টাকা।
চোরাই পণ্য জব্দের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কর্ণঝোড়া বিওপির নতুন ইনচার্জ সুবেদার ফুল মিয়া সরকার। তবে এর বাইরে তিনি আর কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। ৩৯ বিজিবির অধিনায়কও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
মূল প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে—ধরা পড়বে কবে চক্রের মূলহোতারা?
গারো পাহাড়ের সীমান্তে একের পর এক অভিযানে কোটি কোটি টাকার চোরাই পণ্য জব্দ হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটনাস্থল থেকে পণ্য উদ্ধার হলেও চোরাচালানিরা পালিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—শুধু চালান জব্দ করেই কি থামানো সম্ভব এই বিশাল চোরাচালান নেটওয়ার্ক? নাকি এর নেপথ্যে থাকা মূলহোতাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত গারো পাহাড়ে চলতেই থাকবে এই অবৈধ বাণিজ্য?
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, চোরাচালানের মূল উৎস, অর্থদাতা, পরিবহনকারী ও নেপথ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। তাহলেই সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত এই চোরাচালান চক্রের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে।
