শুক্রবার, ৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চোর ধরল মাঠের সাংবাদিক, টাকা কামালো ভুঁইফোড় পোর্টাল, আড়ালে হাসছে দুর্নীতিবাজ—প্রশ্নের মুখে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’

ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি
জুলাই ৩, ২০২৬ ৩:০১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল ছবি

দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচনে মাঠের সাংবাদিক জীবন-ঝুঁকি নিয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেন। কিন্তু সেই কষ্টার্জিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হুবহু চুরি করে, পরে অভিযুক্তদের সঙ্গে গোপন আর্থিক সমঝোতা করে সংবাদ গায়েব—এমন গুরুতর অভিযোগে নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে একশ্রেণির ভুঁইফোড় অনলাইন পোর্টাল ও ফেসবুকভিত্তিক তথাকথিত সংবাদমাধ্যম।

ময়মনসিংহ বিআরটিএকে ঘিরে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে ‘৭৫ বাংলাদেশ’ (75bangladesh.com) নামের একটি অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল ও ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে উঠেছে সংবাদ চুরি, ব্ল্যাকমেইলিং এবং অর্থের বিনিময়ে সংবাদ সরিয়ে দেওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ। সাংবাদিক মহলের মতে, এটি কেবল কপিরাইট লঙ্ঘন নয়; বরং সাংবাদিকতার মুখোশে সংঘটিত এক ধরনের সংগঠিত ডিজিটাল চাঁদাবাজি।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরই শুরু ‘কপি-পেস্ট’ অপারেশন

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৩০ জুন ও ১ জুলাই মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক মামুনুর রশীদ মামুন তথ্য-প্রমাণসহ ময়মনসিংহ বিআরটিএর পরিদর্শক বাবরের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেট ও অনিয়মের বিস্তৃত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘৭৫ বাংলাদেশ’ নামের ফেসবুক পেজ ও অনলাইন পোর্টাল মূল প্রতিবেদকের কোনো অনুমতি ছাড়াই প্রায় হুবহু সংবাদটি নিজেদের লোগো ব্যবহার করে প্রকাশ করে। সংরক্ষিত স্ক্রিনশটে দেখা যায়, “ময়মনসিংহ বিআরটিএতে বেপরোয়া পরিদর্শক বাবর, ঘুষ বাণিজ্য সিন্ডিকেটের গুরুতর অভিযোগ, শিরোনামে সংবাদটি প্রচার করে তারা বিপুল ভিউ, শেয়ার ও পাঠকপ্রতিক্রিয়া অর্জন করে।

জনস্বার্থ নয়, অভিযোগ ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্র হিসেবে সংবাদ

ঘটনার এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ রয়েছে, সংবাদ প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য জনস্বার্থ রক্ষা নয়; বরং অভিযুক্ত কর্মকর্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে আর্থিক সুবিধা আদায় করা।

বিশ্বস্ত একাধিক সূত্রের দাবি, সংবাদটি ভাইরাল হওয়ার পর অভিযুক্ত বিআরটিএ কর্মকর্তা বাবরের সঙ্গে পর্দার আড়ালে বড় অঙ্কের আর্থিক সমঝোতা হয়। আর সেই সমঝোতার পরই রহস্যজনকভাবে সংশ্লিষ্ট সংবাদটি পোর্টাল ও ফেসবুক পেজ থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা বা হাইড করে দেওয়া হয়।

এই ঘটনাই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সংবাদ কি জনস্বার্থে প্রকাশিত হয়েছিল, নাকি দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল?

ক্ষুব্ধ সাংবাদিক সমাজ: এটি সাংবাদিকতা নয়, পরিকল্পিত প্রতারণা

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সাংবাদিক সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাংবাদিকতার ন্যূনতম নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

তাদের মতে—

অন্যের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হুবহু চুরি করা মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের শামিল।

অভিযুক্তের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে সংবাদ গায়েব করে দেওয়া সাংবাদিকতার নয়, অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রকৃত অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের ঝুঁকি বাড়ায় এবং পুরো গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

একাধিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা নানা লেবাস ব্যবহার করে কিছু ভুঁইফোড় পোর্টাল ও ফেসবুক পেজ প্রকৃত সাংবাদিকদের অনুসন্ধানকে পুঁজি বানিয়ে কোটি টাকার চাঁদাবাজি করছে। এতে দুর্নীতিবাজরা যেমন রক্ষা পাচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছে সৎ সাংবাদিকতার মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে মূল দুর্নীতির তদন্ত

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সংবাদ চুরি ও অর্থের বিনিময়ে তা সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে মূল দুর্নীতির বিষয়টি।

ময়মনসিংহ বিআরটিএর পরিদর্শক বাবরের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ বাণিজ্য, সিন্ডিকেট ও অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ: এখনই প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ সাংবাদিকতা ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় অবিলম্বে কয়েকটি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি—

১. কঠোর আইনি ব্যবস্থা:

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত ভূইফোর, কপিরাইট লঙ্ঘনকারী ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ে জড়িত পোর্টাল-পেজগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

২. পাঠকের সচেতনতা বৃদ্ধি:

ফেসবুকভিত্তিক ক্লিকবেইট পেজ ও দায়িত্বশীল মূলধারার সংবাদমাধ্যমের পার্থক্য সম্পর্কে সাধারণ পাঠকদের সচেতন হতে হবে।

৩. মূল দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত:

বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের উচিত পরিদর্শক বাবরের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ, দালাল সিন্ডিকেট ও অনিয়মের অভিযোগের স্বাধীন বিভাগীয় ও আইনি তদন্ত নিশ্চিত করা।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অর্থ উপার্জনের শর্টকাট নয়; এটি জনস্বার্থ রক্ষার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। সংবাদ যদি ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র, সমাজ এবং সর্বোপরি মানুষের গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা।

অতএব, সংবাদ চুরি, ডিজিটাল চাঁদাবাজি এবং অর্থের বিনিময়ে সংবাদ গায়েব করার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এখনই কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে আলোচিত ঘটনার আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া মূল দুর্নীতির অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে—কারণ অপরাধী যে-ই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।