মঙ্গলবার, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ল, ক্ষুব্ধ রাজনৈতিক দলগুলো, অবিলম্বে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ ৭:৩০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল ছবি

এক লাফে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। অবিলম্বে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন দলগুলোর নেতারা।

সোমবার দেওয়া প্রতিক্রিয়া ও পৃথক বিবৃতিতে তারা বলেন, জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহন ও যাতায়াত ব্যয়ে। বাড়বে পণ্য পরিবহন খরচ, উৎপাদন ব্যয় ও বিদ্যুতের খরচ। এর ধারাবাহিকতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।

রোববার রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সোমবার থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে। চার ধরনের জ্বালানির দামই লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

‘জনগণের ওপর জুলুমের বোঝা’

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, এমনিতেই গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনসাধারণের নাভিশ্বাস উঠছে। সরকার এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান করতে পারছে না। মুক্তবাজারের নিষ্ঠুর কষাঘাতে পিষ্ট সাধারণ মানুষের ওপর রাষ্ট্র আবারও চাপিয়ে দিল এক চরম জুলুমের বোঝা।

ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, কৃষি ও গণপরিবহনের চালিকাশক্তি ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১৩৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে সেচ ও উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং প্রান্তিক কৃষকরা আরও চাপে পড়বেন। অন্যদিকে পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং গ্রামীণ মেহনতি মানুষের আলোর উৎস কেরোসিনের দাম ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১৫৫ টাকা হওয়ায় তাদের জীবনেও তীব্র সংকট সৃষ্টি হবে।

‘আমজনতার পকেট কাটার শামিল’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ‘যখন মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তখন বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করে দাম বৃদ্ধি ও জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে সরকারের তথাকথিত লোকসান কমানোর এই নীতি সরাসরি আমজনতার পকেট কাটার শামিল।

তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি চাল, ডাল, সবজিসহ প্রতিটি মৌলিক পণ্যের দামের ওপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব ফেলবে, যা সাধারণ শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের মুখের আহার কেড়ে নেবে।

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ‘বর্তমান সরকার পাঁচ মাসে তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল, যা সরকারের গণবিরোধী নীতির প্রকাশ।

তিনি অবিলম্বে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংকট নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখার দাবি জানান।

ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিবাদ

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুর আহমদ বকুল পৃথক বিবৃতিতে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

তারা বলেন, ‘বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকটময় পরিস্থিতিতে গৃহস্থালি, অফিস, কারখানা, কৃষি, শিল্প ও উৎপাদন পরিপূর্ণ হুমকির মধ্যে। ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতির কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানা যাচ্ছে না। সারাদেশে অস্থির পরিস্থিতি, মানুষ ক্রমাগত ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছে। গরিবের সূচক মাত্রা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে পুনরায় তেলের মূল্যবৃদ্ধি বাজার থেকে উৎপাদন পর্যন্ত সর্বত্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা বলেন, ‘পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, সরবরাহ কমে যাবে। মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে। এ অসহনীয় পরিস্থিতি সাধারণ মানুষ সামাল দিতে পারবে না।

তাদের দাবি, সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো পরিপূর্ণ জ্বালানি নীতি ঘোষণা করা হয়নি। ‘মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তির পর জ্বালানি ক্ষেত্রে একটা লুকোচুরি খেলা হচ্ছে’—এমন মন্তব্য করে তারা বলেন, ‘যখন যেমন তখন তেমন নীতিতে দেশ পরিচালনার নীতি কখনও মঙ্গল বয়ে আনবে না।’

তারা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি না করে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম রাখার দাবি জানান।

‘কৃষি থেকে শিল্প—সবখানেই বাড়বে খরচ’

বাসদের (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, ‘বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধির চাপে পিষ্ট জনগণের কাঁধে আরও মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপালো। জ্বালানি তেলের বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধিতে সেচ খরচসহ কৃষকের উৎপাদন খরচ, শিল্পপণ্য, যাতায়াত, গৃহস্থালি খরচসহ সব পণ্যের দাম কয়েকগুণ বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার এমন সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল, যখন কয়েক বছর ধরে লাভে আছে বিপিসি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সব খরচ ও কর বাদ দিয়ে বিপিসি প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। বিপিসি গত ১১ বছরে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। বছরে গড়ে লাভ সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে সংস্থাটি সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে সোয়া লাখ কোটি টাকার ওপরে।’

গত ১১ বছরে বিপিসির প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা মুনাফার দাবিটি বিভিন্ন বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছে; তবে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির সময় বিপিসি মার্চ-আগস্টে বড় লোকসানের কথা জানিয়েছে।

‘লাভের সুফল জনগণকে দেওয়া হবে না কেন?’

মাসুদ রানা প্রশ্ন করেন, ‘তবে এমন লাভের সুফল জনগণকে কেন দেওয়া হবে না?’

তিনি বলেন, এই উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে আপদকালীন জ্বালানি তহবিল গঠন করা হলে, সেখান থেকে ভর্তুকি দিলে বা ডিজেল আমদানির সময় সরকারের আরোপিত ৩১ দশমিক ৮৫ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স কিছুটা কমালে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখছি—বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পরিকল্পনায় বিশাল বিশাল মেগাপ্রকল্প, নতুন পে-স্কেল ঘোষণা ইত্যাদিই গুরুত্ব পাচ্ছে, যার মাধ্যমে সরকারি ব্যয় বহুগুণ বাড়ছে। অথচ জনগণকে মূল্যবৃদ্ধির কবল থেকে রক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি জনবান্ধব কোনো পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না।’

জনগণের ওপর বিরাট মূল্যবৃদ্ধির বোঝা না চাপিয়ে সরকারি ব্যয় সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বস্তি দেওয়া উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মাসুদ রানার মতে, লাভে থাকার পরও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে সরকারি সেবা খাতে ভর্তুকি কমানোর নামে জ্বালানি তেলের এ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনস্বার্থের পরিপন্থী। তিনি অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারের নীতির সঙ্গে বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক নীতির তুলনা করে দাবি করেন, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং দেশি-বিদেশি পুঁজির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতির সরাসরি ভুক্তভোগী সীমিত আয়ের মানুষ।

অবিলম্বে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তিনি জনগণকে মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।