বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে কি তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য ক্ষমতার কেন্দ্র? প্রশাসনিক পদমর্যাদা, বদলির নীতিমালা, সরকারি চাকরির আচরণবিধি ও জবাবদিহিতার প্রচলিত কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে কি একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা গড়ে তুলেছেন প্রভাব, ক্ষমতা ও ঠিকাদারি সুবিধার এক অপ্রতিরোধ্য বলয়?
অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে এখন এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে ডা. মো. কবির উদ্দীন ও ডা. কবির আহমেদকে ঘিরে ওঠা একের পর এক আলোচিত অভিযোগকে কেন্দ্র করে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই আড়ালে বলছেন—এখন আর নিয়মে নয়, প্রভাবে চলে অনেক কিছু। এমন অবস্থায় ‘খুঁটির জোরে ছাগল লাফায়’—এই প্রবাদই যেন বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
পদমর্যাদা উপেক্ষা করে প্রধান অতিথি, ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা
সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একটি সরকারি অনুষ্ঠানে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। অভিযোগ রয়েছে, অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করা হয় একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও স্বঘোষিত গ্রেডপ্রাপ্ত ভেটেরিনারি সার্জন ডা. কবির আহমেদকে।
অথচ একই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিসিএস ক্যাডারের তৃতীয় গ্রেডের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. রেজওয়ান রহমান এবং চতুর্থ গ্রেডের উপপরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. তারেক।
ভেটেরিনারি সার্জন ডা কবির আহম্মেদ।সিনিয়রিট উপেক্ষা করে নিজেই প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।যা গোটা অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার প্রচলিত কাঠামোর সঙ্গে এমন আয়োজন কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেই প্রশ্ন এখন অধিদপ্তরের ভেতরেই উচ্চারিত হচ্ছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং অধস্তন কর্মকর্তাদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।
প্রভাবের বলয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর, কার ছত্রচ্ছায়ায়?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ডা. কবির আহমেদ দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাবেক সচিব কৃষিবিদ নুরুল ইসলামের বোনজামাই। একই সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এস কে ট্রেডার্স’-এর মালিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত।
সূত্র জানায়, এসব সম্পর্ক ও প্রভাবের কারণেই প্রায় ১৫ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত দায়িত্ব লাভের ঘটনাও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
দুই দপ্তরে এক ব্যক্তি, কোথায় প্রশাসনিক জবাবদিহিতা?
অভিযোগ অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উৎপাদন শাখার সহকারী পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন তিনি।
সরকারি চাকরিতে নির্দিষ্ট সময় পর বদলির বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন একই এলাকায় অবস্থান করে কীভাবে তিনি নিজের প্রভাব অটুট রেখেছেন—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক কর্মকর্তা।
তাদের মতে, একজন কর্মকর্তার হাতে একই সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কেন্দ্রীভূত হওয়া প্রশাসনিক ভারসাম্যের জন্যও উদ্বেগজনক।
চাকরির আড়ালে ঠিকাদারি সাম্রাজ্য?
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো সরকারি চাকরিতে বহাল থেকেও ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা।
অভিযোগ রয়েছে, নিজের প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স এস কে ট্রেডার্স’-এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন ডা. কবির উদ্দীন। প্রকল্প পরিচালকদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে কার্যাদেশ আদায়, পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া এবং গভীর রাত পর্যন্ত অফিস খোলা রেখে টেন্ডার কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তবে তা সরকারি চাকরির নীতিমালা ও স্বার্থের সংঘাতের গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।
টেন্ডার সিন্ডিকেটের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক?
একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী টেন্ডার সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক তিনি।
অভিযোগকারীদের ভাষায়, “অনেক টেন্ডারের ফলাফল আগেই নির্ধারিত থাকে, পরে শুধু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।”
এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা মিললে কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ও কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের নামে প্রকল্প ও দপ্তর থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি হলো, বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস উপলক্ষে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা সংগ্রহের ঘটনা। যদিও অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
খামারিদের ওষুধ কোথায় গেল?
স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ ও ভিটামিন বিনামূল্যে বিতরণের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেকেই সেই সুবিধা পাননি।
বরং সরকারি সামগ্রী ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার বা বিক্রির মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিতরণ রেজিস্টার ও উপকারভোগীদের তালিকা যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা, অথচ সম্পদের পাহাড়?
অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের বিষয়টি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, একজন ৯ম গ্রেডের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও ঢাকায় বাড়ি, নারায়ণগঞ্জে জমিসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি।
তবে এসব সম্পদের উৎস সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা দৃশ্যমান তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। এক ঘটনায় ব্যবস্থা, অন্য ঘটনায় নীরবতা?প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগও জোরালো হচ্ছে।
সম্প্রতি জাতীয় চিড়িয়াখানার একটি মহিষের নামফলকে “ডোনাল্ড ট্রাম্প” নাম ভুলভাবে লেখার ঘটনায় পরিচালক ডা. মো. আতিউর রহমান মিঠুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও, গুরুতর আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও ডা. কবিরের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় তদন্ত বা শোকজ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন—সাধারণ কর্মকর্তার জন্য এক নিয়ম, আর প্রভাবশালীদের জন্য আরেক নিয়ম? বিমাতাসুলভ আচরণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সাধারণ কর্মকর্তা কর্মচারীসহ বিভিন্ন মহল।
তদন্ত হবে, নাকি চাপা পড়বে অভিযোগ?
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেতরে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন—এতসব গুরুতর অভিযোগের পরও কেন প্রশাসনিক নীরবতা?
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে বেরিয়ে আসতে পারে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক প্রভাবের বিস্তৃত চিত্র।
এখন দেখার বিষয়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই অভিযোগগুলো কি নিরপেক্ষ তদন্তের মুখ দেখবে, নাকি প্রশাসনিক নীরবতার আড়ালে হারিয়ে যাবে আরও বহু অভিযোগের মতো।
