আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা থেকে বিএনপন্থী পরিচয়—ক্ষমতার পালাবদলে ‘জার্সি বদলের’ অভিযোগ, সঙ্গে পদোন্নতি ও আর্থিক অনিয়মের নানা প্রশ্ন। ফাইল ছবি
দেশের প্রশাসনে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কর্মকর্তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগ নতুন নয়। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের পরিচালক মো. শাহজামান খানকে ঘিরে সম্প্রতি ওঠা অভিযোগগুলো অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতাসীন বলয়ের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা ভোগ করা এই কর্মকর্তা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে বিএনপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করে শীর্ষ প্রশাসনিক পদে যাওয়ার জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং বাড়ছে নানা প্রশ্ন।
ক্ষমতার পালাবদল, বদলে গেছে রাজনৈতিক পরিচয়?
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মো. শাহজামান খান ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে তিনি একাধিক পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সুবিধা অর্জন করেন।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তার অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে তিনি বিএনপন্থী পরিচয় ব্যবহার করে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন এবং নিজেকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন।
মহাপরিচালক হওয়ার দৌড়ে সিনিয়রদের টপকে যাওয়ার চেষ্টা?
অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো মহাপরিচালক (ডিজি) পদে নিয়োগকে ঘিরে তার তৎপরতা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন, সম্প্রসারণ, উৎপাদন এবং বিভাগীয় পর্যায়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, নিয়মতান্ত্রিক জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি উপেক্ষা করে শীর্ষ পদে যাওয়ার এই প্রচেষ্টা অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতায় পদোন্নতির সুবিধা?
অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী প. ম. রেজাউল করিম এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি প্রশাসনিকভাবে বিশেষ সুবিধা পেয়েছিলেন।
সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, কুমিল্লায় দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে পরিচালক পদে পদোন্নতি এবং পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো নথি প্রকাশ্যে আসেনি।
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও আলোচনায়
মো. শাহজামান খানের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণ খাতের অর্থ ব্যবস্থাপনা, বিশেষ বরাদ্দ গ্রহণ, সরকারি সম্পদের ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অনিয়মিত সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাভারে দায়িত্ব পালনকালে প্রশিক্ষণ ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
৪ আগস্টের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর কৃষি খামার সড়কে অনুষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার অবস্থান পরিবর্তন এবং নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে নানা আলোচনা শুরু হয়। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, তিনি সব সময় ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার কৌশল অনুসরণ করেছেন।
ছাত্রজীবনের রাজনীতি নিয়েও আলোচনা
কিছু সূত্র দাবি করেছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি প্রথমে ছাত্রলীগ এবং পরে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রশাসনে ‘জার্সি বদল’ সংস্কৃতি কতটা ভয়ংকর?
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদায়নের সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কর্মকর্তার রাজনৈতিক অবস্থান বদলের অভিযোগ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।
তাদের মতে, ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, দক্ষতা, সততা ও প্রশাসনিক যোগ্যতাই হওয়া উচিত পদোন্নতি ও নিয়োগের একমাত্র মানদণ্ড।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
মো. শাহজামান খানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ প্রতিবেদনে তার কোনো বক্তব্য যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
