বৃহস্পতিবার, ২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের ‘সিএন্ডএফ ক্লিয়ারিং বাণিজ্য’ বিতর্ক

বিশেষ প্রতিনিধি
জুন ২৪, ২০২৬ ৮:৫৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

লাইসেন্স পরীক্ষায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ, ফল প্রকাশে বিলম্ব, মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত—অবসরের প্রাক্কালে নতুন প্রশ্নের মুখে রাজস্ব প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা। ফাইল ছবি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে সিএন্ডএফ (কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্ট লাইসেন্স পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে। ফল প্রকাশে অস্বাভাবিক বিলম্ব, অতিরিক্ত প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করানোর অভিযোগ, মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত এবং পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগে রাজস্ব প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।

এর সঙ্গে আবারও সামনে এসেছে তার সম্পদ বিবরণী, কর প্রশাসনে ভূমিকা, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং অতীতের বিভিন্ন বিতর্কিত অভিযোগ।

অবসরের আগে ‘শেষ মুহূর্তের তৎপরতা’?

চলতি মাসের ২৯ জুন পর্যন্ত আব্দুর রহমান খানের চাকরির মেয়াদ রয়েছে। জানা গেছে, তিনি ইতোমধ্যে ১ জুন অবসরোত্তর ছুটির (এলপিআর) জন্য আবেদন করেছেন। তবে প্রশাসনিক অঙ্গনে জোর আলোচনা রয়েছে, অবসরের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার আশায় তিনি বিভিন্ন মহলের প্রত্যাশা পূরণে সক্রিয় রয়েছেন।

সমালোচকদের দাবি, এই প্রেক্ষাপটেই সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ সামনে এসেছে।

কোথায় শুরু বিতর্ক?

সিএন্ডএফ লাইসেন্স প্রদান একটি কঠোর নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা আয়োজনের দায়িত্ব এনবিআরের অধীন কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৬ মে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ২ হাজার ৫২১ জন পরীক্ষার্থী। মূল্যায়ন শেষে ২১০ জনকে উত্তীর্ণ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়।

কিন্তু পরীক্ষার পরপরই এনবিআর চেয়ারম্যান কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির মহাপরিচালকের কাছে ১১০ জনের একটি পৃথক তালিকা পাঠান বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চেয়ারম্যান ওই তালিকাকে সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুপারিশ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তালিকাভুক্তদের উত্তীর্ণ করানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, তালিকাভুক্তদের উত্তীর্ণ না করাতে পারলে চেয়ারম্যানের নিজের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এমন ইঙ্গিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছিল।

তবে পরীক্ষা কমিটি বিধিমালার বাইরে গিয়ে কাউকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর থেকেই ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া আটকে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

২৪ ঘণ্টার ফল প্রকাশে লাগল দুই সপ্তাহ

সিএন্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২৬ অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার ফল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে সেই ফল প্রকাশে লেগে যায় দুই সপ্তাহেরও বেশি সময়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ ও পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর অবশেষে ১ জুন ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

মৌখিক পরীক্ষা নিয়েও নতুন নাটক

লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মৌখিক পরীক্ষা আয়োজন নিয়েও দেখা দেয় নতুন জটিলতা।

সূত্র জানায়, বিধিমালা অনুযায়ী ২৬ জুনের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকায় পরীক্ষা কমিটি গত বুধবার মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করে।

কিন্তু এ সিদ্ধান্তে চেয়ারম্যান অসন্তুষ্ট হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরীক্ষা কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সময়সূচি প্রকাশের ঘটনায় চেয়ারম্যান ক্ষুব্ধ হয়ে কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির মহাপরিচালকসহ ছয় সদস্যকে বরখাস্ত করার হুমকি দেন।

এরপর বৃহস্পতিবার ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ জারি করা হয়।

প্রশ্ন উঠেছে—এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা চেয়ারম্যানের রয়েছে কি না এবং এর পেছনে প্রকৃত কারণ কী।

পরীক্ষা নাকি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা?

রাজস্ব প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, লিখিত পরীক্ষার ফল নিয়ে বিতর্কের পর মৌখিক পরীক্ষাও স্থগিত হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

ফলে হাজারো পরীক্ষার্থী চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে পড়েছেন।

পুরনো বিতর্কও ফিরছে আলোচনায়

আব্দুর রহমান খানকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়।

গত বছর তার আয়কর রিটার্নে দেওয়া সম্পদ বিবরণী নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল।

রিটার্ন অনুযায়ী, তিনি উত্তরখানে পৈতৃক সম্পত্তির অংশীদার। এছাড়া রাজধানীর লালমাটিয়া ও ধানমন্ডিতে দুটি ফ্ল্যাট এবং পূর্বাচলে সাড়ে পাঁচ কাঠার একটি সরকারি প্লটের মালিকানা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

সমালোচকদের প্রশ্ন, পৈতৃক সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি কীভাবে সরকারি প্লট বরাদ্দ পেলেন এবং সেই প্রক্রিয়ায় সব নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।

রিটার্নে লালমাটিয়ার একটি ১ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটের মূল্য ১৮ লাখ টাকা এবং বসুন্ধরা-মৌচাক এলাকায় পাঁচ কাঠা জমির মূল্য ২০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে ধানমন্ডির রোড ১১/এ-তে ২ হাজার ৩৭৫ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

এসব সম্পদের ঘোষিত মূল্য বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।

এস আলম গ্রুপ প্রসঙ্গেও প্রশ্ন-

সমালোচকদের অভিযোগ, আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট কর-সুবিধা প্রদানের ঘটনাও আব্দুর রহমান খানের দায়িত্বকালকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদের দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহির ভুয়া পে-অর্ডারের মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কালো টাকা সাদা করার ঘটনায় এনবিআরের কিছু কর্মকর্তা বিশেষ সুবিধা দিয়েছিলেন।

গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং রাষ্ট্রের প্রায় ৭৫ কোটি টাকার ক্ষতির বিষয়ও উঠে আসে।

তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে।

রাজস্ব প্রশাসনের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ-

কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি না পাওয়া, রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা, কর ফাঁকি রোধে দুর্বলতা এবং বড় করদাতাদের প্রতি নমনীয়তার অভিযোগও বারবার সামনে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রশ্নের দায় থেকে রাজস্ব প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্বকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করা যায় না।

সাম্প্রতিক সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষার ঘটনাও সেই বৃহত্তর সংকটের অংশ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারণ, একটি পেশাগত লাইসেন্স পরীক্ষার মতো স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক প্রক্রিয়ায় যদি প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা পুরো রাজস্ব প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

সামনে বড় প্রশ্ন-

অবসরের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। কিন্তু এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানকে ঘিরে বিতর্ক থামার কোনো লক্ষণ নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন একটাই—সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষায় কথিত রাজনৈতিক সুপারিশ, ফল প্রকাশে বিলম্ব, অতিরিক্ত প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করানোর চাপ এবং মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের অভিযোগ কতটা সত্য?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তই পারে এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে।

অন্যথায় দেশের সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রশাসনের ভাবমূর্তি ও জনআস্থা আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ