বৃহস্পতিবার, ২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিআইডব্লিউটিএতে ‘দুর্নীতির সাম্রাজ্য’ গড়ে তোলার অভিযোগ: দুদকের অনুসন্ধান, সম্পদের রহস্য, আরিফ হাসনাতের বরখাস্তে নতুন করে আলোচনায় নৌখাত

স্টাফ রিপোর্টার
জুন ২৪, ২০২৬ ৯:৫৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)—দেশের নৌপথ, নদীবন্দর ও জলপথ ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই সংস্থাটিকে ঘিরে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, ড্রেজিং কার্যক্রমে অনিয়ম, ঘাট ইজারা, টেন্ডার বাণিজ্য, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে, বিশেষ করে বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের সাবেক প্রভাবশালী পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন ওরফে আরিফ হাসনাতকে ঘিরে ওঠা বিতর্কের কারণে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বছরের পর বছর ধরে নৌখাতের হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, ড্রেজিং কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত একটি শক্তিশালী প্রভাববলয়ের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে। সেই বলয়ের সঙ্গে সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার নামও বিভিন্ন অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে।

দুদকের অনুসন্ধানে যে কারণে আলোচনায় আসেন আরিফ হাসনাত

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানী নথি অনুযায়ী, আরিফ হাসনাতের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা হয়।

দুদক তার চাকরিজীবনের আয়-ব্যয়ের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, নদীবন্দর রাজস্ব আদায়, সরকারি কোষাগারে জমা সংক্রান্ত তথ্য এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যবসা ও শেয়ার মালিকানার নথিপত্র সংগ্রহ করে। অনুসন্ধানী চিঠি থেকেই স্পষ্ট হয় যে অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেই তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে কীভাবে বিতর্কের জন্ম?

দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে আরিফ হাসনাতকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ জমা হতে থাকে। অভিযোগে উঠে আসে—

নদীতীর উচ্ছেদ অভিযানে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত;

ফোরশোর লিজ ও ঘাট ইজারা ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম;

নিলাম প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি;

বন্দর প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ;

সরকারি রাজস্ব আদায়ে অসঙ্গতি;

জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের প্রশ্ন।

সমালোচকদের মতে, বিআইডব্লিউটিএর গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে দীর্ঘদিন একই বলয়ের প্রভাব থাকায় জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সেখান থেকেই অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।

সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই

অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, আরিফ হাসনাত ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকা, পূর্বাচল, বসুন্ধরা, এলিফ্যান্ট রোড এবং পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ রয়েছে।

এসব সম্পদের উৎস, বিনিয়োগের প্রকৃতি এবং অর্থের জোগান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরই বিষয়টি দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় আসে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সম্পদের উৎসের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না পাওয়ায় জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

সদরঘাট টেন্ডার ও ইজারা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

সদরঘাট টার্মিনালের লেবার হ্যান্ডেলিং ইজারা সংক্রান্ত টেন্ডারেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় টেন্ডার বিজ্ঞপ্তির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়।

কক্সবাজার ও মাতারবাড়ি প্রকল্পেও বিতর্ক

কক্সবাজারে বিআইডব্লিউটিএর সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ড্রেজড মেটেরিয়াল বিক্রয় এবং মাতারবাড়ি প্রকল্পের বিভিন্ন আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়েও অভিযোগ সামনে আসে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি সম্পদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির কারণে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বিভিন্ন নথি পর্যালোচনার তথ্যও পাওয়া গেছে।

দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগের পরিণতি: বরখাস্ত আরিফ হাসনাত

বিআইডব্লিউটিএর অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নারী কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থার পর্যায়ে পৌঁছায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অভিযোগগুলোর তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে আরিফ হাসনাতের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা তাকে জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।

সমালোচকদের মতে, একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে ওঠা অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি শুধু ব্যক্তিগত অনিয়মের ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং সুশাসন ব্যবস্থার জন্যও বড় সতর্কবার্তা।

এখনো উত্তর মেলেনি যেসব প্রশ্নের

নৌখাতের বড় প্রকল্পগুলোতে প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছিল?

দুদকের অনুসন্ধানে কী তথ্য উঠে এসেছে?

বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে কারা ছিলেন?

রাষ্ট্রীয় ক্ষতির অভিযোগের বাস্তব চিত্র কী?

ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি। তবে বিআইডব্লিউটিএকে ঘিরে ওঠা বিতর্ক, অনুসন্ধান এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ দেশের নৌখাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।