নাম পরিবর্তন, চাকরিতে সনদ জালিয়াতি থেকে অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট—অভিযোগের কেন্দ্রে রাজউকের এই কর্মচারী, প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ ও সম্পদের উৎস। ফাইল ছবি
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মতো দেশের নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থায় দুর্নীতি, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যেন থামছেই না। আবাসন ও ভবনের নকশা অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষকে যেখানে পদে পদে হয়রানি, ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ মোকাবিলা করতে হয়, সেখানে সংস্থাটিরই একাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে অনিয়মের শক্তিশালী বলয়। ফাইল গায়েব, নকশা অনুমোদনে ঘুষ গ্রহণ এবং আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।
এবার সেই অভিযোগের তালিকায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন রাজউকের তৃতীয় শ্রেণির অফিস সহকারী মোশারফ হোসেন স্কাই। অভিযোগের বর্ণনা অনুযায়ী, নাম পরিবর্তন, শিক্ষাগত সনদসংক্রান্ত জটিলতা, পুলিশের চাকরিতে নিয়োগ ও পরবর্তী চাকরিচ্যুতির ঘটনা পেরিয়ে কীভাবে তিনি রাজউকে চাকরি পেলেন, তা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-১ আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের মনোনয়নপত্র কেনার ঘটনাও সামনে এসেছে। একজন সরকারি কর্মচারীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও মনোনয়ন কেনার বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নাম পরিবর্তন থেকে চাকরিতে জালিয়াতির অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মোশারফ হোসেন স্কাইয়ের প্রকৃত নাম মাহবুবুল হক স্কাই। ১৯৮৫ সালে পাবনার সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সময় তিন বছরের জন্য বহিষ্কৃত হওয়ার পর নিজের পরিচয় আড়াল করতে তিনি নাম পরিবর্তন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর মোশারফ হোসেন স্কাই পরিচয়ে জালিয়াতির পথে এগিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগের আরও গুরুতর অংশ হলো, ২০০০ সালে ভুয়া শিক্ষাগত সনদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে চাকরি নেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সনদ জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের চাকরিতে সনদ জালিয়াতির অভিযোগে চাকরিচ্যুত হওয়ার পরও কীভাবে একই ধরনের তথ্য গোপন করে ২০০১ সালের জুলাই মাসে রাজউকের অফিস সহকারী পদে যোগদানের সুযোগ পেলেন তিনি?
একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের আগে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পরিচয় ও পূর্ববর্তী চাকরির ইতিহাস যাচাই করার বাধ্যবাধকতা থাকার কথা। তাহলে মোশারফের ক্ষেত্রে সেই যাচাই কতটা কার্যকর ছিল? তাঁর নিয়োগের সময় দাখিল করা সনদ ও পরিচয়সংক্রান্ত নথি যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
কল্যাণপুরের ফ্ল্যাট থেকে ধানমন্ডির বিলাসবহুল আবাসন
চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই মোশারফ হোসেন স্কাইয়ের সম্পদ অর্জন নিয়ে নানা আলোচনা ও অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, প্রথমদিকে মিরপুরের কল্যাণপুর এলাকায় একটি ফ্ল্যাটের মালিক হন তিনি। পরবর্তী সময়ে সেই ফ্ল্যাট বিক্রি করে রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডিতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিকানা অর্জন করেন এবং সেখানে বসবাস শুরু করেন।
একজন তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয়, চাকরির বেতন ও পরিচিত আর্থিক উৎসের সঙ্গে তাঁর সম্পদের সামঞ্জস্য কতটুকু—এ প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। কল্যাণপুরের ফ্ল্যাট কীভাবে অর্জিত হয়েছিল, সেটি বিক্রির অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং ধানমন্ডির ফ্ল্যাট কেনার অর্থের উৎস কী, এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস ও আয়কর নথি যাচাই ছাড়া অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট দলিল, ব্যাংক হিসাব, আয়কর বিবরণী ও সম্পদ বিবরণীর সমন্বিত অনুসন্ধান।
সরকারি চাকরিতে থেকেও নৌকার মনোনয়ন কেনার ঘটনা
মোশারফ হোসেন স্কাইকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ঘটনাগুলোর একটি হলো তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজউকের সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তিনি সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। এমনকি ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-১ আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের মনোনয়নপত্রও কেনেন।
একজন সরকারি কর্মচারী কীভাবে দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হলেন? সরকারি চাকরির বিধিবিধানের সঙ্গে তাঁর এ ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কোনো সংঘাত তৈরি হয়েছিল কি না? মনোনয়নপত্র কেনার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বা প্রশাসনিক কোনো ব্যাখ্যা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।
সরকারি চাকরিতে থেকে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত আচরণের বিষয় নয়; এটি সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
রাজউকের নজরদারি কোথায়?
রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মচারীর নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য, শিক্ষাগত সনদ, পূর্ববর্তী চাকরির ইতিহাস এবং সম্পদের হিসাব নিয়মিত যাচাই হওয়ার কথা। অথচ এতসব অভিযোগ ও প্রশ্ন সামনে আসার পরও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কার্যকর প্রশাসনিক অনুসন্ধান হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে শিক্ষাগত সনদ জালিয়াতি, পূর্ববর্তী চাকরিতে অনিয়ম, সম্পদের অসংগতি এবং সরকারি চাকরিতে থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষভাবে বিষয়গুলো যাচাই করা। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ও নথির ভিত্তিতে বিষয়টি পরিষ্কার করা জরুরি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
রাজউকের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের লাগাম টানতে হলে শুধু লোকদেখানো প্রশাসনিক পদক্ষেপে কাজ হবে না। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, জাতীয় পরিচয়পত্র, নিয়োগসংক্রান্ত নথি ও চাকরিতে যোগদানের আগের ইতিহাস ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী সম্পদের হিসাব গ্রহণ, আয় ও সম্পদের সামঞ্জস্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুসারে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান পরিচালনা করা জরুরি।
একই সঙ্গে প্লটের ফাইল, ভবনের নকশা অনুমোদন ও অন্যান্য সেবার পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড করা, একই জোনে দীর্ঘদিনের পদায়ন বন্ধ এবং অভিযোগের দ্রুত বিভাগীয় তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
মোশারফ হোসেন স্কাইয়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে রাজউক কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে তাঁর প্রকৃত পরিচয়, শিক্ষাগত সনদ, পুলিশের চাকরিতে নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির নথি, রাজউকে নিয়োগের বৈধতা, সম্পদের উৎস এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—প্রতিটি বিষয় পৃথকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের অসত্যতা থাকলে সেটিও নথিপত্রের মাধ্যমে পরিষ্কার করা জরুরি। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির অভাব ও অনিয়মের অভিযোগের ভার শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ জনগণকেই।
এসব অনিয়মের আদ্যোপান্ত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।
