দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে যখন নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তখন বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব উম্মে রেহানাকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে সরকারি ব্যবস্থার ভেতর থেকে ইন্ধন দেওয়া, বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানির ওপর প্রভাব বিস্তার, নিয়োগ-পদায়ন ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, ঘুষ লেনদেন এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উম্মে রেহানা বর্তমানে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব এবং কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স অধিশাখায় দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও তালিকাভুক্ত রয়েছেন।
দীর্ঘ প্রশাসনিক ক্যারিয়ার, প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, উম্মে রেহানা ২০তম বিসিএসের কর্মকর্তা এবং দীর্ঘ সময় অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসনের এপিডি উইংয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগে তাকে সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হয়েছিল বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
তিনি লিয়েনেও কাজ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর তৎকালীন বিদ্যুৎ সচিব হাবিবুর রহমান ও সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর আশীর্বাদ এবং ডিও লেটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভাগে তার আগমন ঘটে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
তবে এসব পদায়ন বা বদলির পেছনে অনিয়মের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাবেক মন্ত্রীর পিএস থাকার অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, উম্মে রেহানা সাবেক শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ানের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া তার বাবা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং তার ভাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
তবে কোনো ব্যক্তির পারিবারিক বা রাজনৈতিক পরিচয় নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। এ ধরনের অভিযোগ যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রামাণ্য তথ্য প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ‘ইন্ধনের’ অভিযোগ
অভিযোগকারীদের সবচেয়ে গুরুতর দাবি, বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অস্থিরতা তৈরির জন্য উম্মে রেহানা গোপনে বিভিন্ন কোম্পানিকে ইন্ধন দিচ্ছেন।
তাদের অভিযোগ, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং বিদ্যুৎ খাতে অস্থিরতা তৈরি করতে তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করছেন।
তবে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র বা বিদ্যুৎ খাতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
প্রসঙ্গত, ২০২৬ সালের এপ্রিলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উম্মে রেহানা নিজেই জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির কথা জানিয়েছিলেন। সে সময় তিনি জানান, চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে।
কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সে প্রভাব কতটা?
বর্তমানে কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স অধিশাখায় দায়িত্ব পালন করায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তার প্রশাসনিক যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। সরকারি ওয়েবসাইটেও তাকে কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স অধিশাখার যুগ্মসচিব হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই দায়িত্বের সুযোগ নিয়ে তিনি বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), নির্বাহী পরিচালক (ইডি)সহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার করেন।
এমনকি তাকে ‘ডিসিশন মেকার’ হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, তার মতামত ছাড়া সংশ্লিষ্ট অনেক ফাইল নড়াচড়া করে না।
তবে এই দাবির পক্ষে কোনো সরকারি নথি বা সিদ্ধান্তগ্রহণের প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
ডিপিডিসির এমডি নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন
ডিপিডিসির বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নিয়োগের ক্ষেত্রেও উম্মে রেহানার ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ডিপিডিসির জি-টু-জি প্রকল্পের ফ্যাসিস্ট আমলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং তাদের মাধ্যমে তিনি আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন।
ডিপিডিসির বিভিন্ন পদোন্নতি ও নিয়োগে তার প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এমনকি ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে তার বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ওজোপাডিকোর এমডি নিয়োগে ৫০ লাখ টাকার অভিযোগ
অভিযোগের আরেকটি গুরুতর অংশে বলা হয়েছে, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) এমডি নিয়োগে প্রায় ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের সঙ্গে উম্মে রেহানার সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে ‘শোনা যায়’।
অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার আশঙ্কায় তাকে দ্রুত পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।
তবে ৫০ লাখ টাকা লেনদেন কিংবা উম্মে রেহানার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
সম্পদ অর্জন নিয়েও অভিযোগ
উম্মে রেহানার বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিনের চাকরিজীবনে প্রভাবশালী বিভিন্ন পদে থাকার সুযোগ নিয়ে তিনি একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদের মালিক হয়েছেন।
তার স্বামী শিক্ষকতার পাশাপাশি তার প্রভাব ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, মূল্য ও অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো যাচাইকৃত দলিল এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
অভিযোগকারীদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ যাচাই করলে অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা স্পষ্ট হতে পারে।
বিদেশ ভ্রমণ নিয়েও প্রশ্ন
বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের মেয়েকে নিয়ে নেপাল, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রয়োজন ছাড়াই ভ্রমণের অভিযোগও রয়েছে উম্মে রেহানার বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও তিনি বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।
তবে কোন সময়ে, কী সরকারি নির্দেশনা কার্যকর ছিল এবং তার ভ্রমণ তা লঙ্ঘন করেছে কি না—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি।
ফারজানা মমতাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক সচিব ফারজানা মমতাজের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করেছেন উম্মে রেহানা।
সাবেক সচিবের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডে তার ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এমনকি বর্তমানে তাদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।
তবে এ ধরনের যোগাযোগ বা কথিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রূপপুর প্রকল্পের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ
অভিযোগে সবচেয়ে স্পর্শকাতর আরেকটি দাবি হলো—রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য উম্মে রেহানা গোপনে ফাঁস করছেন।
তবে জাতীয় নিরাপত্তা ও পারমাণবিক স্থাপনা সংশ্লিষ্ট এমন গুরুতর অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট নথি, যোগাযোগের রেকর্ড বা প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রয়োজন।
পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার দাবিও
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠতা, বিতর্কিত ভূমিকা ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের কারণে সম্প্রতি উম্মে রেহানা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবে তার পদোন্নতি না হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে কোনো সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এরপরও বিদ্যুৎ বিভাগে তার প্রভাব কমেনি।
কেন এত প্রভাব—উঠছে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশাসনিক পদে থেকেও উম্মে রেহানা বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছেন। কোম্পানিগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার কথাই প্রাধান্য পায় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তাদের প্রশ্ন—একজন যুগ্মসচিবের প্রশাসনিক এখতিয়ার কতটুকু এবং তার বাইরে কোনো প্রভাব থাকলে তার উৎস কোথায়?
সরকারি নথিতে অবশ্য তাকে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব এবং কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স অধিশাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এসব অভিযোগের বিষয়ে যুগ্মসচিব উম্মে রেহানার বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীদের দাবি, উম্মে রেহানার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক পরিচয় বা পক্ষ-বিপক্ষের বিবেচনায় নয়, বরং নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তার সরকারি দায়িত্বের সময়কাল, পদায়ন ও বদলির নথি, বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানির বোর্ড-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, নিয়োগ ও পদোন্নতির ফাইল, বিদেশ ভ্রমণের তথ্য, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব এবং তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ণয় করা সম্ভব হতে পারে।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
