বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিশু জায়হান হত্যা: মাকে সান্ত্বনা দিতে এসে শোকে ভেঙে পড়া বাবার পাশে বসেই ‘হত্যার রহস্য লুকিয়ে রাখে’ প্রতিবেশী

পটিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
জুন ১৮, ২০২৬ ৭:৫৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ায় পাঁচ বছরের শিশু জায়হান হত্যাকাণ্ড ঘিরে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা স্তম্ভিত করেছে পুরো এলাকা। সবচেয়ে ভয়াবহ ও অবিশ্বাস্য দিক হলো—যাকে প্রতিবেশী পরিবার সবচেয়ে বেশি ভরসা করেছিল, সেই ব্যক্তিই নাকি ঘটনার মূল রহস্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

দুই দিন ধরে নিখোঁজ সন্তানকে খুঁজে চলেছেন বাবা-মা। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে পুকুরপাড়, ঝোপঝাড়, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, সব জায়গায় চলছে হাহাকারভরা খোঁজ। সেই অনুসন্ধানের ভিড়েই ছিলেন এক পরিচিত প্রতিবেশীও। তিনি শুধু খোঁজই নেননি, বরং শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, উদ্বিগ্নতার অভিনয় করেছেন এবং দিশেহারা বাবার পাশে বসে চা পর্যন্ত পান করেছেন। কিন্তু পরিবার তখনও জানত না, তাদের বিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম সত্য।

‘ঘরের ভেতরেই আমার ছেলেকে মেরে লুকিয়ে রাখে তারা’

আজ বৃহস্পতিবার সকালে পটিয়া পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ায় জায়হানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের ভারে স্তব্ধ পুরো এলাকা। চারপাশে মানুষের ভিড়, তবে বাতাসে নেমে এসেছে এক গভীর নীরবতা, যা মাঝেমধ্যে ভেঙে যাচ্ছে মায়ের বুকফাটা কান্নায়।

শিশুটির মা জোবাইদা আকতার মুক্তা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আঁর ফোয়ারে ঘরত মারি রাহি আই, এডে আঁরার লগে দুরের।

(আমার ছেলেকে ঘরে হত্যার পর খুনি এসে আমাদের সঙ্গে খোঁজ করেছে।)

তিনি আরও বলেন, ১৫ বছর ধরে একই এলাকার সাইফুদ্দিনদের সঙ্গে তাদের প্রতিবেশী সম্পর্ক ছিল। কখনো ভাবেননি, এমন ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে পারে। এখন তার একটাই দাবি, ছেলের হত্যার সঠিক বিচার।

শোক, ক্ষোভ আর অবিশ্বাসে ভারী এলাকা

জায়হানের বাড়ির সামনে ছোট ছোট দলে মানুষ জড়ো হচ্ছেন—কেউ সান্ত্বনা দিতে, কেউবা শুধু নীরবতা ভাগ করে নিতে। মাঝে মাঝে স্বজনদের কান্না সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে।

ঘরের ভেতরে ছেলের ছবি বুকে নিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা জোবাইদা। তার কথায়, আমার ছেলেটা আমাকে ছাড়া একদিনও থাকতে পারত না। ঘুমাতেও আমাকে পাশে লাগত। সেই ছেলেকে দুই দিন বস্তার ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, নিখোঁজের দিন খোঁজাখুঁজির সময় একবার তিনি একটি শিশুর ‘ও মা’ ডাক শুনেছিলেন। পরে আশপাশের লোকজন সেটিকে অন্য কারও শব্দ বলে তাকে শান্ত করেন। এখন সেই স্মৃতিই তাকে আরও ভেঙে দিচ্ছে।

মুক্তিপণের চিরকুট ও পুলিশের তদন্তে রহস্য উন্মোচন

মঙ্গলবার জায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে একটি চিরকুট পাওয়া যায়। ওই চিরকুটের হাতের লেখার সূত্র ধরেই তদন্তে এগোতে থাকে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, পার্শ্ববর্তী এক প্রতিবেশীকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। ঘটনাস্থল ও তদন্তে শিশুটির মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে।

পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিয়াউল হক জানান, অভিযুক্ত সাইফুদ্দিনের সঙ্গে তার প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাইয়ের জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে অন্য পক্ষকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পুলিশের দাবি: হাতের লেখার মিলেই রহস্যভেদ

বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, সাইফুদ্দিনের মেয়ে সাদিয়া সুলতানা নিহার হাতের লেখার সঙ্গে চিরকুটের লেখার মিল পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয় বলে দাবি পুলিশের।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়।

খোঁজাখুঁজির ভিড়ে ‘অভিনয় করা’ সেই মানুষটি

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজের পর পুরো এলাকায় মাইকিং, পুকুরে জাল ফেলা, ঝোপঝাড়ে তল্লাশি—সবই চলছিল। সেই সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেও খোঁজাখুঁজির সামনের সারিতে ছিলেন।

এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, তাকে দেখে কেউ সন্দেহ করার সুযোগই পায়নি। সে সবার সঙ্গে মিশে গিয়ে এমনভাবে আচরণ করছিল, যেন তিনিও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

আরেক প্রতিবেশীর ভাষায়, সে আমাদের সঙ্গেই খুঁজেছে, সান্ত্বনা দিয়েছে, কে ভাবতে পারে সে এমন কিছু করতে পারে।

১৫ বছরের সম্পর্কের আড়ালে ভয়ংকর ট্র্যাজেডি

এলাকাবাসীর মতে, দুই পরিবারের মধ্যে প্রায় ১৫ বছরের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী সম্পর্ক ছিল। সুখ-দুঃখে একে অপরের পাশে থেকেছে তারা। সেই সম্পর্কের আড়ালেই যে এমন নৃশংস ঘটনা লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।

শেষ প্রশ্ন—শিশুটির কী অপরাধ ছিল?

দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ার সরু গলিগুলোতে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে—একটি পাঁচ বছরের শিশুর কী অপরাধ ছিল?

তদন্ত চলছে, আইনি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। কিন্তু পটিয়ার এই ছোট্ট এলাকায় রয়ে গেছে এক গভীর শূন্যতা, এক শিশুর নিখোঁজ হাসি, মায়ের বুকফাটা কান্না এবং বিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতকতার গল্প।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।