শুক্রবার, ২১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির শপথ, প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

বিশেষ প্রতিনিধি
আগস্ট ২১, ২০২৬ ২:২২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (ফাইল ফটো)

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের (এমপি) প্রত্যক্ষ ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ৩৪৯ ভোটের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হচ্ছেন বিএনপির দুর্দিনের কান্ডারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে দিনভর ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। সংসদের অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ছয়জন ভোটার অনুপস্থিত ছিলেন। বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন বিজয়ী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলামের নাম ঘোষণা করেন। ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি দলের এমপিরা মুহুর্মুহু করতালি ও টেবিল চাপড়ে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান।

ফল ঘোষণার পর মির্জা ফখরুল ইসলামকে গোলাপ ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। পরে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সিনিয়র নেতারা এগিয়ে এলে মির্জা ফখরুল নিজের আসন ছেড়ে সামনে এগিয়ে যান। প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে কোলাকুলি করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি। এরপর বিরোধী দলের উপনেতাসহ অন্যান্য সিনিয়র নেতারাও নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কোলাকুলি করে শুভেচ্ছা জানান।

কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে ভোট শুরু

দুপুর ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শুরুতে নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটের নির্দেশিকা তুলে ধরেন। এরপরই শুরু হয় ভোট গ্রহণ।

দুপুর ২টা ৮ মিনিটে প্রথম ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। পরে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সঙ্গে নিয়ে ভোট দেন সংসদ নেতা তারেক রহমান। এরপর নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ভোট দেন ২টা ১৯ মিনিটে।

সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে তাঁদের নির্ধারিত আসনে বসেই ভোট দেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ২০ জন কর্মকর্তা ভোট গ্রহণে সহায়তা করেন এবং এমপিদের ব্যালট পেপার সরবরাহ করেন।

সরকারি দলের এমপিরা সারিবদ্ধভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়ার সময় অনেককেই হাসিমুখে ছবি তুলতে দেখা যায়। প্রথম দেড় ঘণ্টার মধ্যেই উপস্থিত প্রায় সবাই ভোট দিয়ে ফেলেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের সময় অপেক্ষা করতে হয়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট শুরুর পর সোয়া ঘণ্টার বেশি সময় অধিবেশন কক্ষে নিজের আসনে অবস্থান করেন সংসদ নেতা তারেক রহমান। তাঁর পাশের আসনে ছিলেন দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম। এরপর ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও প্রবীণ এমপি খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

প্রধানমন্ত্রী নিজের আসনে বসে থাকার সময় এমপিরা তাঁর সামনে ভিড় করে দাঁড়ান। সংসদ নেতা তাঁদের সঙ্গে কথা বলে খোঁজখবর নেন। বিকেল ৩টা ১৩ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী সংসদ কক্ষ ছেড়ে সংসদ ভবনের নিজ কার্যালয়ে যান। সঙ্গে নিয়ে যান দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলামকে।

বিকেল ৫টায় ভোট গ্রহণ শেষ ঘোষণা করা হয়। এরপর শুরু হয় ভোট গণনা। বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। রাতেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন।

৩৫ বছর পর আবার ভোটের লড়াই

সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটাভুটি হয়েছিল। এরপর অনুষ্ঠিত সাতটি নির্বাচনে একক প্রার্থী থাকায় প্রত্যেকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এবার আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি পেল বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি যারা

অসুস্থতার কারণে ভোট দিতে না আসার কথা জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের কাছে আগেই চিঠি দিয়েছিলেন ঢাকা-৮ আসনের এমপি মির্জা আব্বাস ও চট্টগ্রাম-৩ আসনের মোস্তফা কামাল পাশা।

এ ছাড়া ভোটে অনুপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের এমপি ওসমান ফারুক। দেশের বাইরে থাকায় ভোট দিতে পারেননি খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান। সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি ও জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল ইসলামও ভোট দেননি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের এমপি রুমিন ফারহানা ভোট দিতে আসেননি। তবে তাঁর অনুপস্থিতির কারণ জানা যায়নি।

কর্নেল অলির অভিনন্দন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ও এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম।

গতকাল দেওয়া এক অভিনন্দন বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি রাষ্ট্র ও সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং ইনসাফের সুরক্ষায় দৃঢ়তা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন। আমি তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করি।

নতুন রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছার ঢল

মির্জা ফখরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানানো হয়।

আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাবে—এই প্রত্যাশা রাখি। তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও দায়িত্ব পালনে আমি সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করছি।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক অভিনন্দন বার্তায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আশা করি, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।’

নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

১২ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন জোটের প্রধান ও জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, জোট মুখপাত্র ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব ড. মাওলানা মুফতি গোলাম মহিউদ্দিন ইকরামসহ অন্যান্য নেতা।

এ ছাড়া ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ও সমমনা জোটের প্রধান সমন্বয়ক ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জাসদ (শাজাহান সিরাজ) সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন খান, মজলিস ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল প্রমুখ নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

ঠাকুরগাঁওয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে নেমে আসে আনন্দের ঢেউ। জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীরা মিষ্টি বিতরণ করেন। পরে বের করা হয় আনন্দ র‍্যালি। শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে র‍্যালিটি জেলা বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।

ঠাকুরগাঁও শহরের হলপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা বলেন, ‘মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় ঈদের চেয়েও আনন্দ লাগছে। কারণ ঈদ বছরে দুইবার এলেও তাঁর মতো মানুষ শত বছরেও আসে কি না সন্দেহ আছে।’

ঠাকুরগাঁও রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মুবীন রতন বলেন, ‘শিক্ষকতা করার কারণে ছোট-বড় সবার স্যার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আমি স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম। তিনি কেমন মানুষ, তা বোঝাবার ভাষা নেই। তবে এতটুকু বলতে পারি, স্যারের ছাত্র হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, ‘আমরা সবাই খুবই আনন্দিত। আনন্দিত হওয়ার কারণ ঠাকুরগাঁও থেকেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিএনপির রাজনীতি শুরু। জেলা বিএনপির সভাপতি থেকে তাঁর উত্থান। তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ ত্যাগ ও তিতিক্ষার পরে তিনি তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু অর্জন করেছেন।

শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর অভিষেক ঘিরে এখন রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও—সবখানেই তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা ও আগ্রহ।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।