বুধবার, ২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

১,৪৯২ কোটি টাকার প্রকল্পে মামুন বিশ্বাস, নিয়োগেই প্রশ্নের ঝড়, পেছনে পুরোনো অভিযোগের ছায়া

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬ ১০:৪৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

এক হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিশাল সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প। একনেকে অনুমোদনের পরও চলছে ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজ। এমনকি প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদনের সরকারি আদেশ—জিও—জারিই হয়নি। এর মধ্যেই পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ঠাকুরগাঁও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাসকে।

আর এই নিয়োগকে ঘিরেই উঠেছে একের পর এক প্রশ্ন।

প্রশ্ন হচ্ছে—প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কেন এত বড় প্রকল্পের পিডি নিয়োগ? আর যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রকল্পটির প্রস্তাব প্রণয়ন ও সাজানোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, তাকেই কেন দেওয়া হলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব?

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও পুরোনো অভিযোগ। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহার, ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ এবং নামে-বেনামে সম্পদ গড়ার অভিযোগ আগেই উঠেছিল মামুন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে।

ফলে ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্পে তাঁর নিয়োগ এখন শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, স্বার্থের সংঘাত এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির প্রশ্ন।

অনুমোদনের পরও ডিপিপি পুনর্গঠন

নথিপত্রের সময়ক্রম বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ২২ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) জেলা সমন্বিত উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদন পায়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে এলজিইডি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত চার বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এতে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পুরো অর্থই সরকারি।

তবে প্রকল্প অনুমোদনের সময় একনেক থেকে ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। বাস্তবায়নকাল সংশোধনের পাশাপাশি পরামর্শক, গাড়ি ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণসহ কয়েকটি ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। এসব ব্যয় অত্যাবশ্যক না হলে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত না করার কথাও বলা হয়।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব জনবলের সর্বোচ্চ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

অর্থাৎ একনেকে অনুমোদনের পরও প্রকল্পের ডিপিপি তখনো চূড়ান্ত ছিল না। বরং একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠনের প্রশাসনিক কাজ চলছিল।

৪ আগস্ট নির্দেশ, ১২ আগস্ট সভা, ১৩ আগস্ট নিয়োগ

এরপর ৪ আগস্ট পরিকল্পনা বিভাগের এনইসি-একনেক ও সমন্বয় অনুবিভাগ থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দিয়ে একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পের ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

চিঠিতে সংশোধিত বাস্তবায়নকাল, একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গৃহীত ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র এবং যথাযথ স্বাক্ষরসহ পুনর্গঠিত ডিপিপি পাঠাতে বলা হয়।

কিন্তু এর মাত্র আট দিনের মাথায়, ১২ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বৃহত্তর দিনাজপুর প্রকল্পের পিডি নিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

পরদিনই, ১৩ আগস্ট, স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা-১ শাখা থেকে এলজিইডির ঠাকুরগাঁও জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাসকে প্রকল্পটির পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে পদায়ন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

সময়ক্রমটি তাই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ—

২২ জুলাই: একনেকে প্রকল্প অনুমোদন

৪ আগস্ট: ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ

১২ আগস্ট: পিডি নিয়োগের সভা

১৩ আগস্ট: মামুন বিশ্বাসের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন

অথচ নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা গেছে, ২৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদনের জিও জারি হয়নি।

এই সময়ক্রমই এখন নিয়োগের বৈধতা ও প্রশাসনিক সামঞ্জস্য নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

‘জিওর আগে পিডি নিয়োগের সুযোগ নেই’

পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের সুযোগ নেই। একনেকের অনুমোদন, এরপর একনেক উইং ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক আদেশ জারির পর পিডি নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স অফিসারের কাছে প্রশাসনিক আদেশ জারি হওয়ার আগে পিডি নিয়োগের সুযোগ নেই।

তবে তিনি জানান, কোনো কোনো সরকারি সংস্থায় প্রকল্প তৈরির সময় থেকেই একজন কর্মকর্তাকে সম্ভাব্য প্রকল্প পরিচালকের মতো করে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রাখা হয়। এতে ভবিষ্যৎ পিডি শুরু থেকেই প্রকল্প সম্পর্কে ধারণা পান।

কিন্তু এর ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। কোনো কর্মকর্তা আগে থেকেই পিডি হওয়ার সম্ভাবনায় থাকলে ডিপিপি তৈরির সময় নিজের সুবিধা বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ডিপিপি প্রণয়নে পক্ষপাতের আশঙ্কা থাকে।

প্রচলিত পরিপত্র নিয়েও প্রশ্ন

পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রচলিত পরিপত্র অনুযায়ী একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রশাসনিক আদেশ বা জিও জারি হয়। এরপর জিও জারির এক মাসের মধ্যে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের নির্দেশনা রয়েছে।

তাঁর মতে, আলোচ্য প্রকল্পে জিও জারির আগেই পিডি নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকলে তা প্রচলিত নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এ প্রশ্ন উঠতেই পারে।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এসএম শাকিল আখতারও জানিয়েছেন, বর্তমান পরিপত্র অনুযায়ী জিও জারির আগে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

তবে তাঁর বক্তব্য, নিয়ম মানতে গিয়ে অনেক প্রকল্পে পিডি নিয়োগ দিতে কয়েক মাস সময় লাগে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুতে বিলম্ব হয়। এ কারণে পরিপত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে এর খসড়া তৈরি হয়েছে।

তবে পরিপত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—এই তথ্য বর্তমান নিয়মের ব্যতিক্রমকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ করে কি না, সেটিও এখন স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

‘অনুমোদিত ডিপিপি’ কোনটি?

মামুন বিশ্বাসকে দেওয়া নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁকে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

৫০ কোটি টাকার বেশি প্রাক্কলিত ব্যয়ের অন্য কোনো প্রকল্পে তিনি দায়িত্বে থাকলে নতুন প্রজ্ঞাপন জারির সঙ্গে সঙ্গে আগের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন বলে গণ্য হবেন। প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি বা আরডিপিপির সংস্থান অনুযায়ী বেতন-ভাতা, যানবাহন, লজিস্টিকসহ অন্যান্য সুবিধা নেওয়ার কথাও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—

পিডি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির সময় যদি একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজই চলমান থাকে, তাহলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা ‘অনুমোদিত ডিপিপি বা আরডিপিপির সংস্থান’ কোন চূড়ান্ত ডিপিপির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছিল?

প্রকল্প তৈরিতে যাঁর ভূমিকা, বাস্তবায়নেও তিনিই?

নিয়োগের বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে মামুন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ওঠা আরেকটি অভিযোগ।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বৃহত্তর দিনাজপুর প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি ও সাজানোর সঙ্গে মামুন বিশ্বাস নিজেই যুক্ত ছিলেন। পরে তাকেই করা হয়েছে প্রকল্পটির পূর্ণকালীন পিডি।

অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করতে হলে কয়েকটি বিষয় নথির মাধ্যমে পরিষ্কার করা জরুরি—

প্রকল্প প্রণয়নের সময় মামুন বিশ্বাসের দায়িত্ব কী ছিল?

ডিপিপি তৈরির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কোনো নথি রয়েছে কি না?

কারা প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করেছেন?

পিডি নিয়োগের সুপারিশের সভার কার্যবিবরণীতে কী যুক্তি দেখানো হয়েছে?

কারণ একটি প্রকল্পের ডিপিপি তৈরির সময় কাজের পরিধি, ব্যয়ের খাত, বাস্তবায়ন কৌশল, পরামর্শক নিয়োগ, গাড়ি ভাড়া, রক্ষণাবেক্ষণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় প্রস্তাব করা হয়।

অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর একই কর্মকর্তা এসব সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন।

ফলে একই ব্যক্তির প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দুই পর্যায়ে ভূমিকা থাকলে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশিদও এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, কাউকে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া এক বিষয় নয়। প্রকল্প অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত ওই কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

পুরোনো অভিযোগের ছায়াও নতুন নিয়োগে

মামুন বিশ্বাসকে ঘিরে প্রশ্ন শুধু নতুন প্রকল্পের নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বিরুদ্ধে এর আগেও দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নিয়মিত সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছেন।

সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে সপ্তাহে দুই দিন ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাবে এতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৭ হাজার ২০০ টাকা, প্রতি মাসে ২৮ হাজার ৮০০ টাকা এবং বছরে প্রায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬০০ টাকা জ্বালানি ব্যয়ের প্রশ্ন উঠে আসে।

আরও অভিযোগ করা হয়, তাঁর পরিবার ঢাকায় বসবাস করায় তিনি প্রতি সপ্তাহে বিমানযোগে যাতায়াত করতেন। এ সময় নিজের দপ্তরের সরকারি গাড়ির পাশাপাশি অন্য দপ্তর—বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) গাড়িও ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন এলজিইডির সাবেক সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিউল আলম, যিনি বর্তমানে পঞ্চগড় এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত—এমন অভিযোগও রয়েছে।

বিমানের টিকিট বাবদ তাঁর সাপ্তাহিক ব্যয় প্রায় ১২ হাজার টাকা, মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে সরকারি চাকরির পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে বাড়ি ভাড়া বাবদ ১৭ হাজার টাকা বাদ দিয়ে তাঁর মাসিক বেতন প্রায় ৫৫ হাজার টাকা—এমন হিসাব তুলে ধরে তাঁর আয় ও কথিত অতিরিক্ত ব্যয়ের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

ঠিকাদারদের ‘ফাইল আটকে’ অর্থ আদায়ের অভিযোগ

মামুন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি এসেছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে।

তাঁদের দাবি, কোনো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর ফাইলে স্বাক্ষরের জন্য হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না দিলে ফাইল দীর্ঘদিন টেবিলে পড়ে থাকে।

ঠিকাদারদের জিম্মি করে কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ও স্বজনদের নামে-বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁরা এসব অভিযোগের দ্রুত তদন্ত দাবি করেন।

অফিসেও ‘ভয়ের পরিবেশ’?

ঠিকাদারদের পাশাপাশি এলজিইডি কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তাঁর ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না বলে অভিযোগ রয়েছে।

অফিসের গাড়িচালকসহ কয়েকজন কর্মচারীর দাবি, মামুন বিশ্বাসের উচ্চপর্যায়ে, মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা এবং এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এই প্রভাবের কারণে তিনি নিয়মের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো কাজ করেন বলে অভিযোগ তাঁদের।

ঠাকুরগাঁও এলজিইডির সাবেক সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে পঞ্চগড় এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল আলমকে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্যার (মামুন বিশ্বাস) হয়তো ভুল করে ফেলেছেন, বিষয়টি এবারের মতো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলে ভালো হতো। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মামুন বিশ্বাস সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ আগেও ছিল। তবে মামুন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ আগে একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

দাবি করা হয়, তিনি একসময় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী হিসেবে উপস্থাপন করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ—অ্যাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

সুশাসনের জন্য তদন্তের দাবি

সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, জবাবদিহিতার অভাব এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই অনেক সরকারি কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন।

তাঁর মতে, এ ধরনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। যথাযথ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি কমানো সম্ভব।

ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, সরকারি সম্পদের ব্যবহার সংক্রান্ত বিদ্যমান নিয়মনীতি মেনে চলার জন্য সব সরকারি কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপরও জেলা পর্যায়ে কোনো ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটলে দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়টি মনিটরিং করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

তবে এ বিষয়ে দুদকের কোনো কর্মকর্তা ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

প্রকল্প যত বড়, প্রশ্নও তত বড়

বৃহত্তর দিনাজপুর প্রকল্পের আওতায় দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার যোগাযোগ ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পে ২১ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক, ১৭১ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক এবং ৮৪২ দশমিক ৫২ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের কথা রয়েছে। পাশাপাশি ১৬টি সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এত বড় প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের অগ্রগতি, ব্যয় ব্যবস্থাপনা, দরপত্র, ঠিকাদারি কাজ, বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং সরকারের কাছে জবাবদিহির বড় অংশই তাঁর দায়িত্বের মধ্য পড়ে।

তাই নিয়োগের শুরুতেই যদি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, ডিপিপি এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপগুলো নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই নজরদারির দাবি তৈরি হয়।

উত্তরহীন কয়েকটি প্রশ্ন

সবকিছু মিলিয়ে সামনে এখন কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন—

একনেকের নির্দেশনা অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজ শেষ হওয়ার আগেই কেন পিডি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?

জিও জারির আগে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন বিধান বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা হয়েছে?

পিডি নিয়োগের সময় চূড়ান্ত অনুমোদিত ডিপিপি কোনটি ছিল?

মামুন বিশ্বাস প্রকল্পটির ডিপিপি প্রণয়ন বা সাজানোর সঙ্গে কতটা যুক্ত ছিলেন?

তাঁর বিরুদ্ধে আগে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগগুলোর কোনো যাচাই বা তদন্ত হয়েছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্পে তাঁর নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক থামার সম্ভাবনা কম।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : প্রকল্পটির পিডি ও এলজিইডির ঠাকুরগাঁও জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বর্তমানে ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে অবস্থান করছেন বলে জানান। এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন কল গ্রহণ করেননি।

ফলে নতুন করে সামনে এসেছে মূল প্রশ্নটিই—

১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার সরকারি প্রকল্পে নিয়োগের শুরুতেই যদি এত প্রশ্ন থাকে, তাহলে প্রকল্পের অর্থ, দরপত্র ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই প্রত্যাশিত।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।