শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

২৯২ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন উধাও! ওএসডি যুব ও ক্রীড়া সচিব মাহবুব-উল-আলম, ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির দুর্নীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন

স্টাফ রিপোর্টার
অক্টোবর ৩১, ২০২৬ ৪:৫৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচিতে প্রায় ২৯২ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বজনপ্রীতি এবং ১৭৪ পৃষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় চলছে প্রশাসনে। এমন পরিস্থিতিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। একের পর এক গুরুতর অভিযোগের মধ্যে এই আকস্মিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এই বিশাল কর্মসূচির আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন গায়েব এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে হয়রানির অভিযোগের মধ্যে সচিবের বদলির ঘটনাটি প্রশাসনিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। তবে এই বদলির সঙ্গে অভিযোগগুলোর সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত ১৮ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন নিয়োগ-১ শাখা থেকে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে মাহবুব-উল-আলমকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার কথা জানানো হয়। উপসচিব জেসী দত্ত স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাস্তবায়িত ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে যখন ধারাবাহিক অনুসন্ধান চলছে, তখন একজন শীর্ষস্থানীয় সচিবের এই বদলি প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে কৌতূহল ও প্রশ্ন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

২৯২ কোটি টাকার অনিয়ম, তদন্তের কেন্দ্রে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের সময় দেশজুড়ে বাস্তবায়িত ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচিতে প্রায় ২৯২ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যাপক স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

বেকার যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্দেশ্যে নেওয়া এই কর্মসূচিতে কীভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থের অনিয়ম ঘটল, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

অভিযোগ রয়েছে, কর্মসূচির নানা অসংগতি ও দুর্নীতির তথ্য উদ্ঘাটনে পরিচালিত তদন্তের প্রায় ১৭৪ পৃষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদনটি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই প্রতিবেদনে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছিল। তবে প্রতিবেদনটি গায়েব হওয়ার অভিযোগের স্বাধীন ও আনুষ্ঠানিক সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে যখন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে তদন্তের মূল নথিই সচিবের দপ্তর থেকে উধাও হয়ে যাওয়ার কথা সামনে আসে। এতে তদন্তের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং নথি সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ওপর চাপ ও হয়রানির অভিযোগ

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে তদন্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ডিডি রোকন উদ্দিন খানের ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে তাঁকে হয়রানি করার অভিযোগ সামনে আসার পর।

অপরাধ তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আর্থিক অনিয়মের প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনে ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় অতীতে পরিচালিত তদন্তের নথিপত্র নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতীতে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন খানের ওপর চাপ ও হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শুধু ওএসডি নয়, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আর্থিক অনিয়ম এবং তদন্ত প্রতিবেদন নিখোঁজের অভিযোগ ঘিরে প্রশাসনের অভ্যন্তরে ও সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকের মতে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, কেবল বদলি বা ওএসডি করার মাধ্যমে এ ধরনের অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে পারে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একটি স্বাধীন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে নিখোঁজ ১৭৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন উদ্ধার এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা চিহ্নিত করা জরুরি।

তাঁদের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাঁদের অবস্থানও স্পষ্ট করতে হবে।

সচিবের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

অভিযোগের বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সরকারি ও ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসনিক কার্যক্রম গতিশীল রাখার স্বার্থে এই বদলি করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে।

তবে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আর্থিক অনিয়ম, তদন্ত প্রতিবেদন নিখোঁজ এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে হয়রানির অভিযোগের সঙ্গে এই বদলির কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ

ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি মূলত দেশের বেকার যুবকদের দক্ষ করে তোলা এবং তাঁদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ত্রুটি, তদারকির ঘাটতি এবং একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের কারণে কর্মসূচিটি এখন বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে।

প্রায় ২৯২ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে না, বরং কর্মসূচির প্রকৃত সুবিধাভোগীদের অধিকার ও জনআস্থার বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর প্রশাসনিক ব্যর্থতা। তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত না নিয়ে নথিপত্র, আর্থিক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।

১৭৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন উদ্ধারই এখন বড় প্রশ্ন

ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির প্রায় ২৯২ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র কী? তদন্তের ১৭৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন কোথায় গেল? প্রতিবেদনে কার কার বিরুদ্ধে কী ধরনের তথ্য ছিল? তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগের সত্যতা কতটুকু? আর অতীতে তদন্ত হলেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, নিখোঁজ নথি উদ্ধারের উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ জরুরি। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর পদমর্যাদা বা পরিচয় বিবেচনা না করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

অন্যদিকে, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন কাউকে যেন হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আর্থিক অনিয়ম ও তদন্ত প্রতিবেদন নিখোঁজের অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি এখন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় সচেতন মহল।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ