সোহাগী জাহান তন
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের মেধাবী ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু—একটি নাম, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অজানা বেদনা, নিঃশব্দ কান্না আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক অবসন্ন গল্প। ঠিক এক দশক পর সেই নীরবতার ভেতর যেন আবারও জেগে উঠেছে আশার ক্ষীণ আলো।
এই বহুল আলোচিত হত্যা মামলায় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মঙ্গলবার গভীর রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। বুধবার বিকেলে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোমিনুল হক তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম জানান, গত ৬ এপ্রিল তিনজন সন্দেহভাজনের ডিএনএ নমুনা ক্রস-ম্যাচের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। এদের মধ্যে রয়েছেন সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সৈনিক শাহিনুল আলম।
গ্রেপ্তারের পর হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলেও আদালত তিন দিনের অনুমতি দেন।
তনুর ভাই মো. রুবেলের কণ্ঠে যেন মিশে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা বেদনা আর প্রত্যাশার ভার। তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা আমাদের আদালতে থাকতে বলেছিলেন। সেখানে এসে জানতে পারি একজন গ্রেপ্তার হয়েছে। আশা করি, এত বছরের অপেক্ষার পর এবার বোনের হত্যার রহস্য উন্মোচিত হবে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ—একটি বিষণ্ন সন্ধ্যা। টিউশনি করাতে গিয়ে আর ফেরেননি তনু। পরে কুমিল্লা সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছের এক জঙ্গলে তার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। সেই রাত যেন থমকে দিয়েছিল একটি পরিবারের স্বপ্ন, আর কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে।
পরদিন তার বাবা অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু তদন্তের পর তদন্তেও মিলেনি কোনো স্পষ্ট উত্তর। পুলিশ, ডিবি, সিআইডি—সবাই চেষ্টা করেও রহস্যের জট খুলতে পারেনি। তবে ২০১৭ সালে সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—তনুর পোশাক থেকে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি। এরপর ২০২০ সালে মামলাটি পিবিআইয়ের হাতে হস্তান্তর করা হয়। একাধিক তদন্ত কর্মকর্তার হাত ঘুরে বর্তমানে দায়িত্বে আছেন পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম।
সময়ের দীর্ঘ অন্ধকার সুড়ঙ্গে হারিয়ে যাওয়া এই মামলায় নতুন এই গ্রেপ্তার যেন আবারও প্রশ্ন তোলে—
তনুর নীরব আত্মা কি এবার পাবে তার ন্যায়বিচার?
দেশজুড়ে আলোচিত এই ঘটনার প্রতিটি মোড় যেন একেকটি অসমাপ্ত গল্পের মতো—যেখানে সত্য এখনো অপেক্ষায়, আর একটি পরিবার এখনো চেয়ে আছে ন্যায়ের আলোয় ভোর হওয়ার দিকে।
