আহসান হাবীব ফাইল ছবি
রাজধানীর ব্যস্ত হৃদয়ে, উন্নয়নের আলো-ছায়ার ভাঁজে যেন এক অদৃশ্য গল্প লিখে চলেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন–এর অঞ্চল–৩ কার্যালয়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগের পর কেটে গেছে সময়, কিন্তু অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিবের নীরবতা যেন আরও গভীর করেছে প্রশ্নের অন্ধকার।
এই নীরবতা—এ কি অনুতাপের ভাষা, নাকি দায় এড়িয়ে যাওয়ার এক নিঃশব্দ কৌশল?
অভিযোগের অন্তরালে এক অদৃশ্য বাণিজ্য
অভিযোগের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক অদ্ভুত বাস্তবতা—যেখানে উন্নয়ন কাজের বিনিময়ে ‘শতাংশ’ দাবি যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এক ভুক্তভোগী ঠিকাদারের ভাষ্যে, টেন্ডার যেন আর প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়; বরং হয়ে উঠেছে অদৃশ্য দরকষাকষির এক গোপন নাট্যমঞ্চ।
তিনি জানান, নিয়ম মেনে কাজ করেও সাম্প্রতিক একটি টেন্ডারে অংশ নিতে গিয়ে তাকে পড়তে হয়েছে অস্বাভাবিক চাপের মুখে। কাজ পাওয়ার আগে ‘অংশীদারিত্বের’ দাবি—না মানলে বাতিলের ছায়া।
প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ
টেন্ডার জমা দেওয়ার পর যেন শুরু হয় এক অদৃশ্য যুদ্ধ। কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে বিলম্ব, অপ্রাসঙ্গিক আপত্তি, আর শেষে প্রতিযোগিতা থেকেই সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা—অভিযোগকারীর কথায় এসব যেন ছিল পূর্বপরিকল্পিত এক কৌশল। ফলে শুধু একটি কাজ হারানো নয়, হারিয়েছে আস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসার ভবিষ্যৎও।
আটকে থাকা অর্থ, থমকে থাকা বিশ্বাস-
অভিযোগ আরও গাঢ় হয় যখন উঠে আসে সিকিউরিটি ডিপোজিট আটকে রাখার প্রসঙ্গ। কাজ শেষ, সময় পেরিয়েছে—তবুও ফেরত মেলেনি প্রাপ্য অর্থ। বরং নতুন করে অর্থ দাবির অভিযোগ, যা সরকারি বিধিমালার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। এ যেন শুধু অর্থের লেনদেন নয়, বিশ্বাসেরও অবরুদ্ধতা।
বিলম্বিত বিল, বাড়তে থাকা চাপ- প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও বিল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা—যেন ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা এক আর্থিক সংকটের ফাঁদ। অভিযোগকারীর দাবি, এই বিলম্ব তাকে ঠেলে দিয়েছে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার দিকে, থামিয়ে দিয়েছে কাজের স্বাভাবিক গতি।
ভয়, চাপ এবং অদৃশ্য হুমকি। সবচেয়ে শঙ্কাজনক অভিযোগ—অভিযোগ প্রত্যাহারে চাপ ও ভয়ভীতি। প্রভাবশালী মহলের নাম ব্যবহার করে হুমকি,ভবিষ্যতের ক্ষতির ইঙ্গিত—এসব যেন এক ভয়াল আবহ তৈরি করেছে, যেখানে সত্য উচ্চারণ করাও হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ।
উন্নয়নের আলোয় ছায়ার বিস্তার- বিশ্লেষকদের মতে, এমন অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির গল্প নয়—এটি পুরো টেন্ডার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হলে দক্ষতা হারায় মূল্য, আর উন্নয়ন হয়ে পড়ে প্রশ্নবিদ্ধ।
নীরবতা ভাঙেনি এখনো- অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও আহসান হাবিবের কোনো বক্তব্য মেলেনি। এই নীরবতা যেন রহস্যকে আরও ঘনীভূত করছে—উত্তরের বদলে জন্ম দিচ্ছে নতুন প্রশ্নের।
বিশেষজ্ঞদের কণ্ঠে সতর্কবার্তা- সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। প্রয়োজনে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে সত্য উদঘাটনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তাদের ভাষায়, জবাবদিহিতা না থাকলে উন্নয়নের প্রতিটি ইটই হয়ে ওঠে সন্দেহের প্রতীক।
প্রত্যাশা—সত্যের উন্মোচন- অভিযোগকারী আশা করছেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তার ক্ষতির প্রতিকার মিলবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত শুধু একটি অভিযোগের নিষ্পত্তিই নয়—এটি হতে পারে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও বিশ্বাস পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
অবশেষে প্রশ্ন একটাই—
নীরবতার আড়ালে কি লুকিয়ে আছে সত্য, নাকি সত্যই অপেক্ষা করছে তার উন্মোচনের উপযুক্ত সময়ের জন্য?
