ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাঘাট, মানুষের কোলাহল আর উন্নয়নের স্বপ্ন—সবকিছুর আড়ালে যেন নীরব এক অদৃশ্য প্রেমকাহিনি চলছে। তবে এই প্রেম আলো নয়, অন্ধকারের; স্বচ্ছতা নয়, দুর্নীতির সঙ্গে এক গভীর, বিপজ্জনক আসক্তি। সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ রাজীব খাদেম—যার হাতে উন্নয়ন যেন হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত লাভের এক গোপন খেলা।
বিশ্বের উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা, যেমন বিশ্বব্যাংক-এর অর্থায়নে পরিচালিত ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’ সেখানে স্বপ্ন ছিল নগরবাসীর জীবনমান উন্নত করার। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই স্বপ্নের ভাঁজে ভাঁজে গড়ে উঠেছে কমিশনের এক নিষ্ঠুর হিসাব—যেখানে প্রতিটি ইট, প্রতিটি পার্ক, প্রতিটি খেলার মাঠ যেন ঘুষের বিনিময়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠিকাদারদের ভাষ্যে, কাজের আগে ভালোবাসা নয়, দিতে হতো “কমিশন”—না দিলে থেমে যেত উন্নয়নের গল্প।
এই কাহিনির আরেকটি অধ্যায় আরও বেদনাময়। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, পছন্দমতো লোক বসানো, আবার মতভেদ হলেই ছেঁটে ফেলা—সব মিলিয়ে যেন এক স্বার্থের নাট্যমঞ্চ। সৎ কর্মকর্তারা এখানে নীরব চরিত্র—চাপ, ভয় আর বদলির আতঙ্কে তারা কেবল দর্শক হয়ে থাকেন।
শুধু আধুনিক প্রকল্প নয়, ইতিহাসও রক্ষা পায়নি। নর্থব্রুক হল—যে স্থাপনায় ঢাকার অতীতের নিঃশ্বাস মিশে আছে, তার সংস্কারেও নাকি লেগেছে অনিয়মের কালো ছাপ। ঐতিহ্যের গায়ে নতুন রঙ নয়, বরং নিম্নমানের উপকরণ আর ভুয়া বিলের মাধ্যমে ক্ষত তৈরি হয়েছে—যেন স্মৃতির শরীরেও চলছে লুটের খেলা।
টেন্ডার, নিয়োগ, উন্নয়ন—সবকিছু ঘিরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল সিন্ডিকেট। অভিযোগ আছে, এই বলয়ের বাইরে কেউ টিকে থাকতে পারে না। যারা সত্যের পথে হাঁটতে চেয়েছেন, তাদের সামনে রাখা হয়েছে বদলি, মামলা বা মানসিক নির্যাতনের ভয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়—এত অভিযোগ, এমনকি একটি হত্যা মামলার আসামি হিসেবেও নাম জড়ানোর পরও তার প্রভাব যেন অটুট। অফিসের ফাইল, প্রকল্পের অনুমোদন, নতুন টেন্ডারের দিকনির্দেশ—সবকিছুতেই তার অদৃশ্য উপস্থিতি।
নগরবাসীর চোখে এখন প্রশ্ন—এ কি উন্নয়নের গল্প, নাকি ধ্বংসের? যেখানে প্রতিটি প্রকল্পের আড়ালে লুকিয়ে আছে ব্যক্তিস্বার্থের গভীর ছায়া।
এই অন্ধকার প্রেমের ইতি টানতে চান সচেতন নাগরিকরা। তাদের দাবি—একটি নিরপেক্ষ জুডিশিয়াল কমিশন, প্রতিটি প্রকল্পের ফরেনসিক অডিট, এবং অবৈধ সম্পদের পূর্ণ হিসাব। কারণ, শহর কেবল ইট-পাথরের নয়—এটি মানুষের স্বপ্ন, বিশ্বাস আর ভবিষ্যতের প্রতীক।
আর সেই স্বপ্ন যদি দুর্নীতির কাছে বন্দী হয়ে পড়ে, তবে শহরের হৃদয়ই ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. রাজিব খাদেম এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার অনিয়মের জবাব এড়াতে বাইরে বেশী সময় কাটানোর অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
