বন অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে যেন এক অদৃশ্য ক্ষমতার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন বিতর্কিত ফরেস্ট রেঞ্জার মো: সুমন মিয়া। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরত খুলতে গিয়ে প্রতিনিয়তই বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন বিস্ময়কর তথ্য—যা শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাকেও করছে ক্ষতবিক্ষত।
প্রথম পর্বে তার নিয়োগের নেপথ্যের অন্ধকার শক্তি ও সহকর্মী রবিউল ইসলামের রহস্যজনক মৃত্যুর ইঙ্গিত উঠে এলেও, দ্বিতীয় পর্বে যেন উন্মোচিত হলো আরও গভীর এক দুর্নীতির জাল। অভিযোগ রয়েছে—তিনি নিজের প্রভাব বলয় ব্যবহার করে নির্বাচনী বিধিনিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকারি বদলি আদেশ পর্যন্ত স্থগিত করাতে সক্ষম হয়েছেন।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর, নিয়ম অনুযায়ী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম ৪ মার্চ একটি অফিস আদেশে তাকে বালিজুড়ী রেঞ্জ থেকে উথুরা রেঞ্জে বদলি করেন। কিন্তু এই নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্তই যেন সুমন মিয়ার ক্ষমতার অহংকারে আঘাত হানে। এরপরই শুরু হয় এক নেপথ্য তৎপরতা—যেখানে প্রশাসনিক নিয়মকে ছাপিয়ে যায় ব্যক্তিগত প্রভাব ও অর্থের খেলা।
সূত্রের দাবি, বদলি ঠেকাতে তিনি শেরপুর জেলা নির্বাচন অফিসারের মাধ্যমে একটি বিতর্কিত পত্র জোগাড় করেন, যেখানে নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। অভিযোগ আরও গুরুতর—ঢাকা অঞ্চলের বন সংরক্ষক এ.এস.এম. জহির উদ্দিন আকনও নাকি মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সেই বদলি আদেশ স্থগিত করেন। বন বিভাগের ইতিহাসে এমন নজিরবিহীন ঘটনা কর্মকর্তাদের মাঝেই তীব্র ক্ষোভ ও অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, বালিজুড়ী রেঞ্জে তার কর্মকাণ্ড যেন এক সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের চিত্র তুলে ধরে। সরকারি মূল্যের চেয়ে কম দামে কাঠ বিক্রি দেখিয়ে লট ক্রেতাদের সঙ্গে গোপন সমঝোতা, প্রতি লটে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত কমিশন গ্রহণ—এসব অভিযোগ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এর ফলে রাষ্ট্র হারিয়েছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব, যা কয়েক বছরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে কোটি টাকায়।
শুধু কাঠ বাণিজ্যই নয়—বাগান সৃজনে ভুয়া বিল, বনভূমি দখলে সহায়তা, অতিরিক্ত গাছ কাটার সুযোগ—সব মিলিয়ে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বল্প সময়ে তিনি গড়ে তুলেছেন ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়। আর এই অর্থ প্রবাহের একটি বড় অংশ নাকি যায় তার প্রভাবশালী ‘ছাতা’ কর্মকর্তার কাছে।
বর্তমানে তিনি ঢাকা অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কালিয়াকৈর রেঞ্জে পদায়নের জন্য মরিয়া—এমন অভিযোগও উঠেছে। তবে বন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এমন বিতর্কিত ব্যক্তির হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দেওয়া হলে তা বন ব্যবস্থাপনার জন্য হতে পারে এক মারাত্মক ঝুঁকি।
প্রশ্ন উঠছে—একজন রেঞ্জার কীভাবে পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকে প্রভাবিত করার মতো শক্তি অর্জন করলেন? এই ‘অদৃশ্য নেটওয়ার্ক’-এর শেষ কোথায়?
এখনই যদি এই চক্রের লাগাম টেনে ধরা না হয়, তবে শুধু বন নয়—রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ভিতও নড়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
