রানা প্লাজা ধসে দুই পা হারিয়ে পঙ্গুত্বের জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর বারাই চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামের রেবেকা বেগম। পঙ্গুত্বের কারণে সন্তানদের কোনো আবদার পূরণ করতে না পারার আর্তনাদ আর আক্ষেপই এখন তাঁর নিত্যসঙ্গী সমতল মাতৃভূমি
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল—একটি সকাল, যা মুহূর্তেই রূপ নেয় মৃত্যুর কালো অন্ধকারে। রানা প্লাজা ধস কেবল একটি ভবনের পতন ছিল না, ছিল হাজারো স্বপ্ন, হাসি আর জীবনের নির্মম ভাঙন। ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ধ্বংসস্তূপের ধুলো আজও শুকায়নি—বরং তা জমাট বেঁধে আছে বেঁচে থাকা মানুষের বুকের গভীরে।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর রেবেকা বেগম—যার দুই পা রয়ে গেছে সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে। জীবন থেমে নেই, কিন্তু চলার শক্তি নেই। বিছানার কোণায় বসে তিনি আজও অনুভব করেন ভেঙে পড়া কংক্রিটের ভার। সন্তানদের দিকে তাকিয়ে তাঁর অসহায় চোখ যেন প্রতিদিনই বলে—“আমি আছি, কিন্তু পারছি না।” মায়ের এই নীরব যন্ত্রণা সন্তানদের ভবিষ্যতের ওপর ছায়া ফেলে রাখে এক দীর্ঘশ্বাসের মতো।
একই উপজেলার আরেকটি বাড়িতে সময় যেন থমকে আছে। নিখোঁজ গুলশানে জান্নাত শাবানার জন্য অপেক্ষা আজও শেষ হয়নি। তাঁর স্বামী আতাউর রহমান এখনো বিশ্বাস আর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে—একদিকে স্মৃতি, অন্যদিকে শূন্যতা। ছোট্ট সন্তানদের চোখে মায়ের মুখ ঝাপসা হয়ে গেছে, কিন্তু অপেক্ষার গল্পটা আজও স্পষ্ট, গভীর, আর কষ্টে ভরা।
সে দিনের ধসে প্রাণ হারান ১,১৩৬ জনের বেশি শ্রমিক, আহত হন ২,৪৩৮ জন। যারা ফিরে এসেছেন জীবনে, তারা যেন ফিরে আসেননি পুরোপুরি—কেউ হারিয়েছেন হাত, কেউ পা, কেউবা জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। বেঁচে থাকাটা তাদের কাছে প্রতিদিনের যুদ্ধ, প্রতিটি নিশ্বাস একেকটি সংগ্রাম।
নিলুফার ইয়াসমিনের কণ্ঠে আজও কান্নার ভার—“আমরা আর কত কাঁদব?” ফুটপাতে ছোট্ট দোকান করে কোনোমতে চলছিল জীবন, সেটিও হারিয়ে গেছে। চিকিৎসা আর সংসারের খরচের টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত ফিরতে হয়েছে গ্রামে। সেখানে আছে শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা, কিন্তু নেই নিশ্চয়তা।
পারুল বেগম—ধ্বংসস্তূপের নিচে আট ঘণ্টা লড়াই করে ফিরে এসেছিলেন জীবনে। কিন্তু সেই ফিরে আসা ছিল না পূর্ণতা নিয়ে। শরীরের ভেতরে জমে থাকা ব্যথা, কিডনির জটিলতা আর প্রতিদিনের যন্ত্রণা তাকে মনে করিয়ে দেয়—তিনি এখনও সেই দিনের ভাঙনের অংশ। তাঁর স্বামীও আঘাত নিয়ে বেঁচে আছেন, অল্প আয়ে টেনে নিচ্ছেন সংসারের ভাঙা হাল।
এই দীর্ঘ ১৩ বছরে বিচার যেন হয়ে উঠেছে এক অনন্ত প্রতীক্ষা। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা দ্রুত বিচার, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের দাবি তুলেছেন। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট-এর আয়োজনে সেই সভায় উঠে আসে এক কঠিন সত্য—মামলা হয়েছে, সময় গেছে, কিন্তু বিচার আজও অধরা।
রানা প্লাজা সারভাইভার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, ক্ষতিপূরণের বড় অংশই পৌঁছায়নি প্রকৃত ভুক্তভোগীদের হাতে। প্রতিশ্রুত পুনর্বাসন আজও অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো দূরবর্তী।
এই গল্প কোনো কেবল দুর্ঘটনার নয়—এটি মানুষের, যন্ত্রণার, আর অবহেলার দীর্ঘ কাব্য। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া দেহগুলো মাটি পেয়েছে, কিন্তু চাপা পড়ে থাকা স্বপ্নগুলো আজও মুক্তি পায়নি। যারা বেঁচে আছেন, তারা প্রতিদিন সেই দিনের সঙ্গে লড়াই করে—নিঃশব্দে, নিরন্তর।
