শুক্রবার, ১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ব্যাংক–বিশ্ববিদ্যালয় ‘ক্ষমতা বলয়’: এম এ কাসেমকে ঘিরে গভীরতর প্রশ্নে নতুন (পর্ব-২)

নিজস্ব প্রতিবেদক
মে ১, ২০২৬ ১:৩৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

দেশের ব্যাংকিং ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক সিদ্ধান্তে একক আধিপত্যের অভিযোগে আবারও আলোচনায় এম এ কাসেম। পূর্ববর্তী পর্বগুলোতে আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য, জমি ক্রয় ও তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এলেও নতুন এই পর্বে উঠে এসেছে আরও কাঠামোগত ও গভীর প্রশ্ন—প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে কীভাবে গড়ে উঠল এক অদৃশ্য ক্ষমতা বলয়, কেন সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক নির্দেশ প্রাধান্য পাচ্ছে, আর কেনই বা কর্মকর্তাদের একটি অংশ প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন।

আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আড়ালে ‘সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ’?
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সাউথইস্ট ব্যাংক এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়—দুটি বড় প্রতিষ্ঠানে কাগজে-কলমে প্রশাসনিক কাঠামো থাকলেও বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর রয়েছে এক ধরনের সমান্তরাল প্রভাব ব্যবস্থা।

বোর্ড সভা, সিন্ডিকেট বা ব্যবস্থাপনা কমিটির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের বাইরে অনানুষ্ঠানিক নির্দেশনাই অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঋণ অনুমোদন, বড় অঙ্কের ব্যয়, গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, আইটি প্রকল্প, ক্রয় অনুমোদন কিংবা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে নীতিনির্ভর কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

‘যোগ্যতা নয়, আনুগত্য’—কর্মপরিবেশে অস্বস্তি-অভিযোগকারীদের মতে, এই ধরনের পরিবেশে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্য পায়। ফলে কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও পেশাদারিত্বের সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ভালো কাজ করলেই উন্নতি হবে—এই বিশ্বাস হারিয়ে গেলে প্রতিষ্ঠান ভেতর থেকে ভেঙে পড়তে শুরু করে।

ব্যাংক খাতে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে পদোন্নতি ও পদায়ন প্রক্রিয়া। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ভালো পারফরম্যান্স দেওয়া কর্মকর্তারা কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি পাচ্ছেন না, অন্যদিকে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞতার কিছু কর্মকর্তা দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে আসছেন। যদিও এসব অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়েও একই চিত্র? একাধিক শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার অভিযোগ, বিভাগীয় উন্নয়ন,কোর্স চালু, গবেষণা বরাদ্দ, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা প্রশাসনিক নিয়োগ—এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশের চেয়ে প্রভাবশালী মহলের অবস্থান বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে শিক্ষক সমাজে হতাশা তৈরি হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া দুর্বল হলে শিক্ষা ও গবেষণার মান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ভয়ের সংস্কৃতি ও নীরবতা-অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভিন্নমত প্রকাশ করলে পদোন্নতি আটকে যাওয়া, প্রশাসনিক হয়রানি বা প্রান্তিককরণের আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেকেই অনিয়ম দেখলেও নীরব থাকেন।

এক কর্মকর্তা বলেন, চাকরি আছে, পরিবার আছে—ঝুঁকি নিতে চান না কেউ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতা প্রতিষ্ঠানকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলে, কারণ এতে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতার ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে।

সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত-ব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়েও আলোচনা চলছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু তহবিল ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে রাখা হয়েছে, এবং দুই প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে একই প্রভাব বলয়ের উপস্থিতি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সম্পর্ক আইনগতভাবে অনুমোদিত হলেও স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

দুর্বল বোর্ড গভর্ন্যান্স—মূল সমস্যা? করপোরেট গভর্ন্যান্স বিশ্লেষকদের মতে, বড় প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রভাব বলয় তৈরির অন্যতম কারণ হলো দুর্বল বোর্ড তদারকি। যদি বোর্ড সদস্যরা স্বাধীনভাবে মতামত দিতে না পারেন, পর্যাপ্ত তথ্য না পান বা নির্বাহী সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে যাচাই না করেন—তাহলে কিছু ব্যক্তি সহজেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে চলে আসেন।

একজন বিশেষজ্ঞের ভাষায়, প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে সিস্টেমে, ব্যক্তি দিয়ে নয়। সিস্টেম দুর্বল হলে প্রভাবই নিয়ন্ত্রণ নেয়। কমিটি সংস্কৃতি ও ‘বিশ্বস্ত নেটওয়ার্ক’
অভিযোগ রয়েছে, ঘনিষ্ঠদের বিভিন্ন কমিটি, উপদেষ্টা পদ ও প্রশাসনিক অবস্থানে বসিয়ে একটি ‘বিশ্বস্ত নেটওয়ার্ক’ তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার পথ সংকুচিত হয় এবং একই গোষ্ঠীর আধিপত্য স্থায়ী হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত কমিটি গঠন অনেক সময় প্রশাসনিক প্রয়োজনের চেয়ে আনুগত্য বণ্টনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, যা আর্থিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা প্রশ্নে-ব্যাংকিং খাতে তদারকি সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় খাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পর্যাপ্ত নজরদারি থাকলে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকার সুযোগ পেত না বলে মনে করছেন অনেকে।

আস্থার সংকট ও সংস্কারের প্রয়োজন অতি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনআস্থা, আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি হলো শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিশ্বাস। এই দুই জায়গায় দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক তৈরি হলে তা পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাদের মতে, পরিস্থিতি উত্তরণে প্রয়োজন—স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকাশ্য নিরীক্ষা প্রতিবেদন, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, শক্তিশালী অডিট ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা, হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা। বড় আর্থিক সিদ্ধান্তে তৃতীয় পক্ষের যাচাই।

প্রতিক্রিয়া অনুপস্থিত, প্রশ্ন রয়ে গেছে-এম এ কাসেম বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে নীতিগতভাবে তদন্ত ছাড়া কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ সম্ভব নয়—এমনটিই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য যে, ব্যক্তি নাকি প্রতিষ্ঠান? সব মিলিয়ে এই বিতর্ক এখন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সীমা ছাড়িয়ে সুশাসনের বৃহত্তর প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্নগুলো স্পষ্ট—
প্রতিষ্ঠান কি নিয়মে চলবে, নাকি প্রভাবে?
সিদ্ধান্ত কি কাঠামো নেবে, নাকি ব্যক্তি?
জবাবদিহিতা কি কাগজে থাকবে, নাকি বাস্তবে কার্যকর হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে—এটি কি সাময়িক বিতর্ক হয়ে থাকবে, নাকি দেশের ব্যাংকিং ও শিক্ষা প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কারের সূচনা ঘটাবে।
চলবে…….

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।