বৃহস্পতিবার, ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নগর গণপূর্তে ‘ম্যানেজ মাস্টার’ আবুল কালাম আজাদ—টেন্ডার কারসাজি, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রভাবের জাল নিয়ে বিস্তর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ৩০, ২০২৬ ৯:৪৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও টেন্ডার কারচুপির অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলে ‘ম্যানেজ মাস্টার’ নামে পরিচিত এই কর্মকর্তা সম্পর্কে বলা হয়—তিনি যেখানে দায়িত্ব পালন করেন, সেখানেই প্রভাব বিস্তার করে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে টিকে থাকেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার এক বিশেষ দক্ষতা রয়েছে তার। ফলে যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, তিনি সেই বলয়ের আস্থাভাজন হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থেকেছেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আজাদ বর্তমানে এমন একটি ডিভিশনে দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এপিপি) খাতে বড় অংকের বরাদ্দ রয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগও ব্যাপক।

টেন্ডার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন এবং বিল পরিশোধ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই অনিয়মের ছাপ স্পষ্ট।

* প্রাক্কলনে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো
* দরপত্রের তথ্য আগেভাগে ফাঁস
* দর-কষাকষির নামে কমিশন বাণিজ্য
* পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে শর্ত পরিবর্তন
টেন্ডার মূল্যায়নে পক্ষপাতিত্ব

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি ব্যাপকভাবে ওটিএম (ওপেন টেন্ডার মেথড) পদ্ধতি ব্যবহার করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এলটিএম (লিমিটেড টেন্ডার মেথড) অনুসরণ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ওটিএম পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতিযোগিতা সীমিত করা হয়েছে। ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করার দরপত্র আইডিগুলি হলো- ১০৬২৬৪৮, ১০৬২৬৫১, ১০৬২৬৫২, ১০৬২৬৪৯, ১০৬২৬৫৪, ১০৬২৬৫৩, ১০৫৬১৪৩, ১০৫৬১৪৪, ১০৬০৩৫৮, ১০৬২৬৭১, ১০৬২৬৪৭, ১০৬২৩৯৬, ১০৫৬১৪৭, ১০৬২৩৮৫, ১০৬৯৮৯৯, ১০৭১২৭১, ১০৭১৭৬৬, ১০৬৯৯০০, ১০৬৯৯০১, ১০৬৮৮৬৫, ১০৭০৭২৯, ১০৭১৭৭৮, ১০৭১৭৭৯, ১০৭১৭৮০, ১০৬৯৪৬২, ১০৬৮৮৭০, ১০৫৬১৪১, ১০৬৮৮৬৪, ১০৬৮৯০১, ১০৫৭৯৪৪, ১০৫৭৯৪৬, ১০৬৮৮৬০, ১০৬৮৮৯৬, ১০৬৯১৭৩, ১০৬২৬৭২, ১০৬৮৮৬৩, ১০৬৮৮৫৯, ১০৬৮৮৫১, ১০৫৭৮১৩। উক্ত দরপত্র আহ্বান করেছেন গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৫, ২৭ জানুয়ারি ২০২৫ ও ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। এভাবেই তিনি ওটিএম দরপত্র আহ্বান করে কোটি কোটি টাকা ঘুষ আদায় করেন।

পছন্দের ঠিকাদার সিন্ডিকেট
নগর গণপূর্ত বিভাগে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী কালাম নিজেই। এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে— টেন্ডার দাখিলের আগেই গোপন সমঝোতা,
অপছন্দের ঠিকাদারদের ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণা
নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দিয়ে প্রতিযোগিতা সীমিত করা।

আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টেন্ডার ডকুমেন্ট এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদার ছাড়া অন্য কেউ অংশ নিতে না পারে।

কমিশন বাণিজ্য: কাজের আগে ৩% বিলের জন্য ৫% পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি প্রকল্পে নির্দিষ্ট হারে কমিশন আদায় করা হয়— চুক্তির সময় ৩ শতাংশ, বিল পরিশোধের সময় ৫ শতাংশ যেন কালামের অঘোষিত নিয়ম।

তবে এই অর্থ লেনদেন পরিচালনায় তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা সক্রিয় থাকেন। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে কমিশনের পরিমাণ আরও বেশি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই কমিশন বাণিজ্যই পুরো ব্যবস্থাকে দুর্নীতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

নিম্নমানের নির্মাণ ও ব্যয় বৃদ্ধি- নগর গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও গুরুতর। নির্ধারিত মানের চেয়ে কম মানের রড ব্যবহার, সিমেন্ট ও বালুর অনুপাত ঠিক না রাখা,
নিম্নমানের ইট ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার।

এছাড়া প্রকল্পের ছক সংশোধনের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বড় প্রকল্পকে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করে অনুমোদন প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া হয়।

বিল পরিশোধে অনিয়ম ও হয়রানি- ঠিকাদারদের অভিযোগ, কাজ সম্পন্ন করার পরও বিল পেতে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। আর্থিক সমঝোতা না হলে বিল আটকে রাখা, আংশিক বিল পরিশোধ, পছন্দের ঠিকাদারদের দ্রুত বিল নিষ্পত্তি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি সৃষ্টি হচ্ছে এবং ঠিকাদারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।

রাষ্ট্রীয় স্থাপনাতেও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়ে নিজেদের পকেট ভারী করার অভিযোগ রয়েছে। নগর গণপূর্ত বিভাগের আওতাধীন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় মেরামত ও সংস্কার কাজের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কাজের অনেকগুলোই প্রয়োজনীয়তা ছিল না, বরং আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে।

পিপিআর ২০২৫ বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ-সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০২৫ সংশোধন করা হলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে— আইন যতই শক্তিশালী হোক, বাস্তবায়নকারীরা যদি অনিয়মে জড়িত থাকেন, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।

প্রশাসনিক প্রভাব ও টিকে থাকার কৌশল-
অভিযোগ রয়েছে, আবুল কালাম আজাদ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ক্ষমতার পালাবদলে অবস্থান পরিবর্তন,
গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা হয়েছে।

দুদকের নজরদারি ও তদন্ত দাবি-
নগর গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট মহল নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নথিপত্র, টেন্ডার রেকর্ড ও আর্থিক লেনদেন যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

উল্লেখ্য যে, উত্থাপিত অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি শুধু একজন কর্মকর্তার অনিয়ম নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়।
এখন দেখার বিষয়—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ নেয়। এমনটাই দেখার প্রহর গুনছেন সংশ্লিষ্ট মহলসহ নেটিজেনরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।