অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা—গণপূর্ত অধিদপ্তর। অথচ জনস্বার্থে কাজ করার এই প্রতিষ্ঠানটিই এখন যেন অভিযোগ, অনিয়ম আর অস্বচ্ছতার ভারে ন্যুব্জ। আর এই বিতর্কের কেন্দ্রে ঘুরপাক খাচ্ছে এক নাম—তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান। যাকে ঘিরে দপ্তরের ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছে এক ‘অদৃশ্য ক্ষমতার বলয়’।
শত কোটি টাকার ছায়া সাম্রাজ্য—উৎস কোথায়?
দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা অভিযোগে উঠে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য। সীমিত বেতনের চাকরি করেও বদরুল আলম খানের নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে বিপুল সম্পদের পাহাড়—ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট, গ্রামে বিলাসবহুল বাড়ি, খামার, ব্যাংকে অস্বাভাবিক অঙ্কের লেনদেন। প্রশ্ন উঠছে—এই সম্পদের উৎস কী? নাকি ক্ষমতার প্রভাবেই তৈরি হয়েছে এক ‘নীরব সাম্রাজ্য’?
সিন্ডিকেটের শৃঙ্খলে বন্দী টেন্ডার প্রক্রিয়া? দপ্তরের একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, বদরুলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে—ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলার প্রভাবশালী ঠিকাদারদের নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্ক, যেখানে টেন্ডার আর উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার নয়—বরং ‘নির্বাচিতদের জন্য সংরক্ষিত’।
ফোনেই ঠিকাদার নির্ধারণের বিষয়টি সামনে এসেছে।
তবে অভিযোগ আরও গুরুতর— বিভিন্ন ডিভিশনের প্রকৌশলীদের সরাসরি ফোন করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। মিরপুর, ভাষানটেকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ‘পছন্দের ঠিকাদার’ বসানোর চেষ্টা হয়েছে—এমন অভিযোগ ঘুরছে দপ্তরের ভেতরে। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে—প্রকল্প বাস্তবায়ন কি আদৌ নীতিমালার আলোকে হচ্ছে, নাকি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নির্দেশেই পরিচালিত?
রাজনৈতিক পালাবদলেও অটল প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে বদরুল এর বিরুদ্ধে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের আগে-পরে বলয় পরিবর্তনের অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি—ক্ষমতার পালাবদল হলেও বদরুলের অবস্থান একচুলও নড়েনি; বরং নতুন সমীকরণে আরও দৃঢ় হয়েছে তার প্রভাব। যেন তিনি ‘অপরিহার্য’ এক কেন্দ্রবিন্দু, যাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে দপ্তরের সিদ্ধান্ত।
পর্দার আড়ালে ব্যবসা ও স্বার্থের সংঘাত? সরকারি চাকরির পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনের নামে ডেভেলপার ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা হবে সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত, যা সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী।
নিয়োগে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ তুঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন—নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জনপ্রতি ১০-১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। যদিও কাজ না হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে অর্থ ফেরতের ঘটনাও ঘটেছে বলে শোনা যাচ্ছে। এতে করে দপ্তরের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হয়েছে চরম অসন্তোষ ও অবিশ্বাস।
‘ব্ল্যাকমেইল সিন্ডিকেট’—আরও বিস্ফোরক অভিযোগ।
এক তথাকথিত সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার সংক্রান্ত গোপন তথ্য ফাঁস, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে সুবিধা আদায়—এসব নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। যদিও এসব দাবির স্বাধীন যাচাই এখনও হয়নি, তবুও অভিযোগের মাত্রা দপ্তরের ভেতরে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করেছে। তবে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। ওই সাংবাদিকের সঠিক তথ্য প্রমাণ সহ প্রকাশ পাবে।
ভেতরে ফুঁসছে ক্ষোভ—‘মুকুটহীন সম্রাট’ বিতর্ক এখন আলোচনার কেন্দ্রে। গণপূর্তের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখন ক্ষোভ স্পষ্ট। অনেকেই বলছেন, একটি ব্যক্তি কেন্দ্রিক আধিপত্যের কারণে নীতি, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। দপ্তরের ভেতরে বদরুলকে ঘিরে ‘মুকুটহীন সম্রাট’ তকমা ছড়িয়ে পড়েছে—যা প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বদরুলের জবাবে
সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমি সততার সঙ্গে কাজ করছি বলেই একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। সিন্ডিকেট বা দুর্নীতির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এতে প্রশ্ন রয়ে গেল—গণপূর্ত অধিদপ্তর কি এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করবে? নাকি অদৃশ্য প্রভাবের ছায়ায় ‘একচ্ছত্র আধিপত্য’ আরও বিস্তৃত হবে? দপ্তরের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ কি শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরিত হবে—নাকি চাপা আগুনই থেকে যাবে? এমনটার উত্তর খুঁজছে নেটিজেনরা।
