ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) সরকারি নথিতে যেসব মার্কেটকে বহু আগেই “পরিত্যক্ত” ও “অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ” ঘোষণা করা হয়েছে, বাস্তবে সেই ভবনগুলোতেই চলছে হাজারো মানুষের অবাধ যাতায়াত, জমজমাট বাণিজ্য আর প্রভাবশালীদের রমরমা নিয়ন্ত্রণ। কাগজে ভবন মৃত— অথচ বাস্তবে সেখানে কোটি টাকার বাণিজ্য, অবৈধ কমিটির দাপট আর উৎসবমুখর নির্বাচনের মহড়া যেন থামছেই না।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা— যেকোনো সময় ঘটতে পারে আরেকটি ‘রানা প্লাজা’ ট্র্যাজেডি। তবু রহস্যজনক কারণে নীরব প্রশাসন।
ডিএনসিসির ১৬ মার্চ ২০২৩ সালের সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বুয়েটের মূল্যায়নে সংস্থাটির মালিকানাধীন মোট ১৮টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরও আগে ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি ও ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভায় পাঁচটি মার্কেটের আটটি ভবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে “পরিত্যক্ত” ঘোষণা করে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই তালিকায় রয়েছে—মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেট (পাকা ও কাঁচা), গুলশান কাঁচা মার্কেট (উত্তর), গুলশান পাকা মার্কেট (দক্ষিণ), রায়েরবাজার মার্কেট, কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেট, কারওয়ান বাজার ১ ও ২ নম্বর ভবন এবং কারওয়ান বাজার আড়ৎ মার্কেট।
কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন সরকারি সিদ্ধান্তকে উপহাস করছে।
সরেজমিনে ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, “পরিত্যক্ত” ঘোষিত এসব ভবনে প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করছেন। শুধু তাই নয়, সেখানে প্রকাশ্যে চলছে তথাকথিত “বণিক সমিতি”র কার্যক্রম।
আবার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম-ছবি-মোবাইল নম্বরসহ ব্যানার টাঙিয়ে নিজেদের প্রভাব জানান দিচ্ছেন নেতারা। নিয়মিত বিরতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নির্বাচনও— যেন সবকিছুই বৈধ ও স্বাভাবিক।
প্রশ্ন উঠেছে— যে মার্কেট সরকারিভাবে অস্তিত্বহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে আবার কিসের নির্বাচন? কার অনুমতিতে গঠিত হচ্ছে কার্যকরী কমিটি?
আইনজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কোনো সরকারি ভবন একবার “পরিত্যক্ত” ও “বিপজ্জনক” ঘোষিত হলে সেখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি। আর সেই ভবনের নামে কমিটি গঠন কিংবা নির্বাচন আয়োজন তো সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। তাদের ভাষায়, এটি মূলত সরকারি সম্পত্তিতে অবৈধ নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখার কৌশল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— এসব মার্কেট থেকে ডিএনসিসি কোনো বৈধ রাজস্ব পাচ্ছে না। কারণ সরকারি খাতায় ভবনগুলো কার্যত “বন্ধ”। অথচ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত আদায় করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের চাঁদা ও ভাড়া। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের বড় অংশ যাচ্ছে অবৈধ কমিটির নেতা, দালালচক্র ও প্রভাবশালীদের পকেটে।
ফলে একদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে আটকে পড়ছেন সাধারণ ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। ভুক্তভোগীরা দুর্ঘটনার শিকার হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ফিরে পায় চাঁদ রাত। তখন তাদের ব্যস্ততা এতই বেড়ে যায় মনে হয় শতভাগ দায়িত্ব পালন করে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। আসলে এটা লোক দেখানো নাটক।
এ নিয়ে এখন সরব নগরবাসীও। তাদের প্রশ্ন— বছরের পর বছর ধরে এত বড় অবৈধ কর্মকাণ্ড কীভাবে প্রকাশ্যে চলতে পারে? ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক কর্মকর্তা, জোনাল নির্বাহী কর্মকর্তা ও সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা কি কিছুই জানেন না? নাকি নীরবতার আড়ালে রয়েছে অন্য কোনো সমঝোতা?
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ডিএনসিসির এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশেই এই “পরিত্যক্ত মার্কেট সাম্রাজ্য” টিকে আছে। কাগজে-কলমে নোটিশ জারি করলেও বাস্তবে উচ্ছেদে নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ।
এ বিষয়ে আঞ্চলিক-৫ এর নির্বাহী কর্মকর্তা ম. সাদিকুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা একাধিকবার নোটিশ দিয়েছি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা স্থান ত্যাগ করেননি। এমনকি নোটিশ টানানোর কিছুক্ষণ পরই সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়।
তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন— শুধু নোটিশ দিয়েই কি দায় শেষ? যদি আজই কোনো ভবন ধসে শত শত প্রাণহানি ঘটে, সেই দায় কে নেবে?
নগর পরিকল্পনাবিদ, আইনজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, বিষয়টি এখন শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি। তাই অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার কঠোর হস্তক্ষেপ জরুরি। না হলে যেকোনো সময় রাজধানী সাক্ষী হতে পারে আরেকটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের।
