প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পাদক পরিষদ নেতারা। ছবি: বাসস/ পিএমও
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে দেশের পুরোনো ও “অগণতান্ত্রিক” আইনের ধারা বাতিল বা সংশোধনের জোর দাবি তুলেছে সম্পাদক পরিষদ। রোববার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সামনে সরাসরি এসব দাবি তুলে ধরেন দেশের শীর্ষ সম্পাদকরা।
বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়—বর্তমান গণমাধ্যম-সংক্রান্ত অনেক আইনই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব আইনের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে ‘ফর্ম বি’
সম্পাদক পরিষদ বিশেষভাবে তুলে ধরে পত্রিকা প্রকাশের ঘোষণাপত্রের ‘ফর্ম বি’-এর একটি বহুল সমালোচিত ধারা। সেখানে প্রকাশকদের লিখিতভাবে ঘোষণা দিতে হয় যে, তারা “সরকারের স্বার্থের পরিপন্থী” কোনো কিছু প্রকাশ করবেন না।
সম্পাদকদের ভাষায়, এই শর্ত সরাসরি সংবিধানের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে রয়েছে স্পষ্ট অগণতান্ত্রিক চরিত্র। তাই বৈঠকে ওই ধারা বাতিলের জোর দাবি জানানো হয়।
গণমাধ্যম কমিশন নাকি শক্তিশালী প্রেস কাউন্সিল?
বৈঠকে আরেকটি বড় প্রস্তাব ছিল দ্রুত গণমাধ্যম সংস্কারের উদ্যোগ। সম্পাদক পরিষদ সরকারের কাছে গণমাধ্যম কমিশন গঠন অথবা বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিলকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার আহ্বান জানায়।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তথ্যমন্ত্রীকে আগামী জুনের মধ্যে বিষয়গুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে জুলাইয়ের মধ্যেই দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে জানানো হয়।
“সরকার নিয়ন্ত্রক নয়, সহায়ক হতে চায়”
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে নয়, বরং সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে চায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনে স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম অপরিহার্য।
প্রধানমন্ত্রী আরও গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এর জবাবে সম্পাদক পরিষদ জানায়, ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সাংবাদিকদের জন্য একটি “কোড অব কন্ডাক্ট” বা আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘হয়রানিমূলক মামলা’ নিয়েও উদ্বেগ
বৈঠকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হয়রানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তোলা হয়।
সম্পাদক পরিষদ জানায়, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হতে হবে। তবে ভয়ভীতি বা চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে মামলা ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন।
বৈঠকে যারা ছিলেন
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
সম্পাদক পরিষদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন নূরুল কবীর, দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, মতিউর রহমান, মাহফুজ আনামসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পাদকরা।
বৈঠক শেষে একটাই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে—গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দাবিতে এবার কি সত্যিই বদলাবে পুরোনো আইনের কাঠামো, নাকি আলোচনা শেষ হবে কেবল আশ্বাসেই?
