সোমবার, ১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

“ঘুষের টাকায় পদোন্নতির নীলনকশা” বিচারাধীন মামলা গোপন করে অবৈধ সুপারিশের অভিযোগে গণপূর্তের সারওয়ার জাহান বিপ্লব ঘিরে তোলপাড়

আবদুর রহমান
মে ১৮, ২০২৬ ২:১৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সিন্ডিকেট, আদালতকে বিভ্রান্তি ও কোটি টাকার পদোন্নতি বাণিজ্যের বিস্ফোরক অভিযোগ।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মোহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লবকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সরকারি চাকরি বিধি, উচ্চ আদালতের বিচারাধীন মামলা এবং প্রশাসনিক নীতিমালাকে পাশ কাটিয়ে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি পাইয়ে দিতে “ম্যানেজড মতামত” তৈরির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিপুল অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে মন্ত্রণালয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মতামত পাঠানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে এখন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—“বিচারাধীন মামলা আড়াল করে কার স্বার্থে এই তৎপরতা?” আর সেই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতেই উঠে এসেছে সারওয়ার জাহান বিপ্লবের নাম।

জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে বিস্ফোরক দ্বন্দ্ব-

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-৭ থেকে জারি করা স্মারক নং-২৫.০০.০০০০.০০০.১৩০.১৯.০০১৭.১৮(অংশ-১)-৩৮৯; তারিখ: ১০ মে ২০২৬ অনুযায়ী, বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ই/এম অংশের কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত জ্যেষ্ঠতা তালিকা নিয়ে ওঠা আপত্তির বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সুস্পষ্ট মতামত চাওয়া হয়।

কারণ, ২৭, ২৮ ও ৩০তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন—সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া কিছু কর্মকর্তাকে বেআইনিভাবে ৫ম গ্রেডের ঊর্ধ্বে পদোন্নতি দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। অথচ সরকারি বিধিমালায় এ বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

“মামলা খারিজ” না “Not Press”?—তথ্য গোপনের অভিযোগ

বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয় যখন ৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে স্মারক নং-২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১২.১০৭.১৮-৩৫২ এর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক মতামতে সারওয়ার জাহান বিপ্লব দাবি করেন—১৭টি পদ সংরক্ষণ সংক্রান্ত মামলা মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হয়ে গেছে।

কিন্তু বিসিএস কর্মকর্তারা পাল্টা অভিযোগ করে জানান, মহামান্য আপিল বিভাগে Civil Petition No. 4340/2024 এখনও বিচারাধীন এবং মামলার কেস হিস্ট্রি সুপ্রিম কোর্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও বিদ্যমান।

আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—১৭ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে Civil Miscellaneous Petition No. 360/2013 “Rejected for not press” হিসেবে নিষ্পত্তি হলেও সেটিকে “মামলা খারিজ” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

আইনজীবীদের মতে, “Not Press” মানে আবেদনকারী আবেদনটি আর চাপ দেননি বা স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করেছেন; এটি মূল মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়। ফলে বিচারাধীন বাস্তবতা গোপন করে মন্ত্রণালয়কে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ এখন জোরালোভাবে উঠেছে।

সরকারি বিধিমালা পাশ কাটিয়ে পদোন্নতির ছক?

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা, ২০১৭ এর ধারা-৮। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে—সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে ৫ম গ্রেডের উপরে পদোন্নতির সুযোগ নেই।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই বিধি পাশ কাটিয়ে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে উন্নীত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন সারওয়ার জাহান বিপ্লব।

২৭, ২৮ ও ৩০তম বিসিএস কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যেহেতু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে ৫ম গ্রেডে পদোন্নতি একই বিধিমালার আওতায় হয়েছে, সেহেতু ধারা-৮ তাদের ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক। কিন্তু সারওয়ার জাহান বিপ্লব তার মতামতে দাবি করেন—সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীদের জন্য ওই বিধিমালা প্রযোজ্য নয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষায়, এটি আইনকে নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে অবৈধ পদোন্নতির রাস্তা পরিষ্কার করার অপচেষ্টা।

উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়েও প্রশ্ন

অভিযোগ রয়েছে, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ চলাকালে জারি হওয়া নিয়োগ প্রজ্ঞাপনের বৈধতা, ০৪/০৯/২০১২, ১৮/০৯/২০১২ ও ১৯/০৯/২০১২ তারিখে যোগদানের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ এবং দায়িত্ব পালন ছাড়াই বকেয়া বেতন উত্তোলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও তার মতামতে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এখন নতুন করে আরেকটি “ম্যানেজড মতামত” তৈরির কাজ চলছে। সেখানে বিচারাধীন মামলা, বিধিগত বাধা ও সাংবিধানিক সমতার প্রশ্ন আড়াল করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পক্ষে সুপারিশ পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

“ঘুষের টাকায় পদোন্নতি”—অভিযোগে তোলপাড়

অভিযোগকারীদের দাবি, এই পুরো প্রক্রিয়ায় মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে এবং সেই টাকার প্রভাবেই সক্রিয় হয়েছেন সারওয়ার জাহান বিপ্লব। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে এখন আলোচনা—একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ঘুষের বিনিময়ে জ্যেষ্ঠতা তালিকা, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক মতামত নিয়ন্ত্রণ করছে।

একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এটি শুধু পদোন্নতির অনিয়ম নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সরকারি চাকরি বিধির ওপর সরাসরি আঘাত।
অতীতেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ।
সারওয়ার জাহান বিপ্লবের অতীত রেকর্ড নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশ নং-২৫.০০.০০০০.০৩৭.০১৮.২৭.০০০৩.২৫-২৩৯; তারিখ: ২৯ জুন ২০২৫ অনুযায়ী, গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে কাশিমপুর কারাগার-২ প্রকল্পে ঠিকাদারের জমাকৃত ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়নের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়।

পরবর্তীতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা হলেও “প্রথম অপরাধ” বিবেচনায় তাকে সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়।

তবে এখন প্রশ্ন উঠছে—যে কর্মকর্তা অতীতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন, তিনিই কীভাবে বিচারাধীন মামলা গোপন করে পদোন্নতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে মতামত দেন?

গণপূর্তে ‘সিন্ডিকেট রাজ’ নিয়ে বাড়ছে ক্ষোভ

গণপূর্তের সচেতন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষায়, যোগ্যতা ও বিধিমালার পরিবর্তে যদি ঘুষ, তদবির আর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পদোন্নতি নির্ধারিত হয়, তাহলে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে।

তারা অবিলম্বে বিচারাধীন মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ, পদোন্নতি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ তদন্ত এবং অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ