ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী দোসর ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কথিত ‘মাফিয়া নেটওয়ার্ক’-এর অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান মুন্সী ওরফে টিপু মুন্সির ভায়রা আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে এবার উঠে এসেছে ভয়ংকর সব দুর্নীতির অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে—ঢাকায় ‘লাভজনক’ পোস্টিং নিশ্চিত করতে অন্তত ১০ কোটি টাকার তদবির ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি আবারও ক্ষমতার বলয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
সূত্র বলছে, টিপু মুন্সির প্রত্যক্ষ ছত্রচ্ছায়ায় আবু নাসের চৌধুরী ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল–২-এ নিজের পোস্টিং নিশ্চিত করেন। এর আগে দীর্ঘদিন গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে টেন্ডার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
কিন্তু রহস্যজনকভাবে সব অভিযোগই ধামাচাপা পড়ে যায়। আর সেই পুরোনো প্রভাব খাটিয়েই আবারও ঢাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন তিনি—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বগুড়ায় ওটিএম কেলেঙ্কারি: এলটিএম এড়িয়ে কোটি কোটি টাকার ভাগ-বাটোয়ারা!
অভিযোগ রয়েছে, বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালে আবু নাসের চৌধুরী পরিকল্পিতভাবে এলটিএম পদ্ধতি এড়িয়ে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র অনুমোদন দেন। আর এই পদ্ধতির আড়ালেই চলে কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য ও আত্মসাতের মহোৎসব।
বিশেষ করে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দ ও এপিপিভুক্ত কাজগুলোতে ওটিএম পদ্ধতির অনুমোদন দিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমপক্ষে ১০ শতাংশ কমিশন আদায়ের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগে উল্লেখিত ওটিএম টেন্ডার আইডিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১১১১৭৮১, ১১১৯৩১৬, ১১১৩০৭৯, ১১১১৫৬৩, ১১১১৫৫৮, ১১১১৫৫৯, ১১১১৫৬০, ১১১১৫৭০, ১১১১৫৬৭, ১১১১৫৬৯, ১১১১৫৬১, ১১১১৫৬৪, ১১১১৫৬৫, ১১১১৫৬৬, ১০৮১৫৪৬, ১১০০৭৯০, ১১০২০২৮, ১০৯১৯৭৩, ১০৯১৯৭৪, ১০৯১৯৭৫, ১০৯১৯৭৬, ১০৯১৯৭৭, ১০৯১৯৭৮, ১০৯১৯৭৯, ১০৮২১৫৯, ১০৮০২৩৫, ১০৮০২৩৬, ১০৬৯১৩১, ১০৭০৮৭৪, ১০৭০৮৭৫, ১০৭০৮৭৬, ১০৭১২৬৫, ১০৪৩২৪৮, ১০২৯৫৯৬ ও ১০১৮১৫৯।
ভেরিয়েশন বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ
শুধু টেন্ডার নয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে “ভেরিয়েশন” সুবিধা দেখিয়েও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন আদায় করা হতো নিয়মিত।
সপ্তাহে দুই দিন অফিস, বাকি সময় ঢাকায় পোস্টিং তদবির!
অভিযোগ অনুযায়ী, বগুড়া সার্কেলে দায়িত্বে থাকলেও সপ্তাহে মাত্র দুই দিন অফিস করতেন আবু নাসের চৌধুরী। বাকি সময় কাটাতেন ঢাকায়—‘ওয়াকিং সার্কেল’ ও পরবর্তীতে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল–২-এর পোস্টিং বাগিয়ে নেওয়ার তদবিরে।
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই তার অনিয়মিত উপস্থিতি ও অফিস ফাঁকির বাস্তব চিত্র বেরিয়ে আসবে।
ফ্ল্যাট, জমি ও ব্যাংক ব্যালেন্স—সম্পদের পাহাড় ঘিরে প্রশ্ন
আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী তার সম্পদের তালিকায় রয়েছে—
বসুন্ধারা আবাসিক এলাকার আই ব্লকে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট
মোহাম্মদপুরে আরেকটি ফ্ল্যাট
বারিধারা ও গুলশান–২ এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট
গাজীপুরে প্রায় ২০ একর জমি
Uttara Bank PLC-এ বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা
এসব সম্পদের বৈধ উৎস কী—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
টিপু মুন্সির ছায়াতেই ‘অপ্রতিরোধ্য’ দাপট!
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী টিপু মুন্সির ভায়রা হওয়ার সুবাদেই ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে পুরো গণপূর্ত অধিদপ্তরে কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন আবু নাসের চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে কথা বললেই বদলি, হয়রানি কিংবা পদোন্নতি আটকে দেওয়ার ভয় কাজ করত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
বর্তমানে আবারও পুরোনো সেই “ফ্যাসিবাদী আচরণ” ফিরে আসছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গণপূর্তের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা বলছেন, দুর্নীতির এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে তুলে ধরা জরুরি।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আবু নাসের চৌধুরীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
