পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ারকে ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আনুগত্য বদল, বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিশেষ সুবিধায় সবুজ পাসপোর্ট প্রদান, প্রশাসনের ভেতরে দলীয় বলয় রক্ষা এবং হাজার কোটি টাকার ই-পাসপোর্ট প্রকল্পে অনিয়ম—সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি ধাপে নিজের অবস্থান সুরক্ষিত রাখতেই রাজনৈতিক রঙ বদল করেছেন এই কর্মকর্তা। কখনও আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ, কখনও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনপন্থী, আবার বর্তমানে বিএনপিপন্থী জেনারেল হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
জানা যায়, ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ার। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায় তিনি টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সে সময় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে পাসপোর্ট অধিদপ্তর পরিচালনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন তিনি। তার ওই অবস্থান ও বক্তব্য প্রশাসনের ভেতরে তাকে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবেই পরিচিত করে তোলে।

তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টাতেই বদলে যেতে থাকে তার অবস্থানও—এমন অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনের অভ্যন্তর থেকেই। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৫ আগস্টের পর থেকেই তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে শুরু করেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নতুন ক্ষমতার বলয়ে প্রবেশ করে নিজের অবস্থান নিরাপদ করতেই শুরু হয় এই নতুন কৌশল।
পরবর্তীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর আবারও অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ শুরু করেন এবং নিজেকে “বিএনপিপন্থী জেনারেল” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালান। সরকারের উচ্চপর্যায়ে আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে নেপথ্যে রাজনৈতিক লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত সমর্থিত ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মো. আবদুল বাতেনকে নিজের কার্যালয়ে নিয়ে আসার ঘটনাও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ওই বৈঠকের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে নির্বাচনী বাস্তবতা বদলে যাওয়ার পর দ্রুতই নিজ এলাকার বিএনপি নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুধু রাজনৈতিক যোগাযোগ নয়, প্রশাসনের অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগপন্থী কর্মকর্তাদের বহাল রাখার ক্ষেত্রেও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন দপ্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একাধিক কর্মকর্তা এখনও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, ডিজি নূরুল আনোয়ারের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়াতেই এসব কর্মকর্তা স্বপদে বহাল রয়েছেন।
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়েও একাধিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর বাসায় গিয়ে পাসপোর্টের জন্য আঙুলের ছাপ ও ছবি সংগ্রহ করেন পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা—যা তার নির্দেশেই করা হয়েছিল বলে প্রশাসনের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
একইভাবে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সবুজ পাসপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে প্রশাসনের অভ্যন্তরে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
অভিযোগের তালিকায় রয়েছে আরও কয়েকটি চাঞ্চল্যকর নাম। সাবেক প্রধান বিচারপতিকে সবুজ পাসপোর্ট প্রদান, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিমকে কূটনৈতিক সুবিধাসংবলিত সবুজ পাসপোর্ট করে দেওয়া এবং ঢাকার এক সাবেক পুলিশ কমিশনারকে বিশেষ সুবিধার আওতায় পাসপোর্ট দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী বহু ব্যক্তি এবং বিতর্কিত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে সবুজ পাসপোর্ট পাইয়ে দিয়ে দেশত্যাগে সহায়তা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ভেতরে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে জানা গেছে।
এদিকে দুর্নীতির অভিযোগেও বারবার আলোচনায় এসেছে তার নাম। বিশেষ করে সরকারের বহুল আলোচিত ই-পাসপোর্ট প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সূত্রগুলোর দাবি, শুরুতে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প হিসেবে নেওয়া ই-পাসপোর্ট কার্যক্রমের ব্যয় পরবর্তীতে বাড়িয়ে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো, সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়ম এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে অস্বচ্ছতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করা হয়েছে।
প্রশাসনের একাধিক সূত্র বলছে, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা রাজনৈতিক ছত্রছায়া ব্যবহার করে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করছে। আর সেই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছেন ডিজি নূরুল আনোয়ার—এমন অভিযোগও এখন জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি এড়িয়ে যান। পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল কেটে দেন।
