হানিফ মিয়া
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে উঠেছিল এক অসহায় মানুষের বুকফাটা আর্তচিৎকারে। ফোনের ওপাশে কাঁপা কণ্ঠে স্ত্রী আয়েশা বেগমকে বলছিলেন কাঠব্যবসায়ী হানিফ মিয়া—
“আমাকে বাঁচাও… জাকির ও তার লোকজন আমাকে মেরে ফেলবে…”
কিন্তু সেই আর্তনাদ শেষ পর্যন্ত আর তাকে বাঁচাতে পারেনি। কিছুক্ষণ পরই নিথর হয়ে পড়ে থাকেন ৩৪ বছর বয়সী হানিফ মিয়া। পরিবারের দাবি, এটি কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়—এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত, নৃশংস ও ঠান্ডা মাথার হত্যার ফাঁদ।
ঘটনাটি ঘটেছে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকায়। নিহত হানিফ মিয়া ওই এলাকার ইব্রাহিম মিয়ার ছেলে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রতিবেশী লসকর মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন হানিফকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর রাত বাড়তে থাকলেও হানিফ আর বাড়ি ফেরেননি। ঠিক রাত ১২টার দিকে স্ত্রী আয়েশার মোবাইলে আসে সেই বিভীষিকাময় ফোনকল। স্বামীর কণ্ঠে আতঙ্ক, কান্না আর মৃত্যুভয়ের ছাপ স্পষ্ট ছিল।
খবর পেয়েই পরিবারের সদস্যরা ছুটে যান লসকর মিয়ার বাড়িতে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বাড়ির সব গেট তখন ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। বারবার অনুরোধ করেও কেউ গেট খোলেনি। অসহায়ের মতো বাইরে দাঁড়িয়ে শুধু চিৎকার আর অপেক্ষাই করতে হয়েছে পরিবারকে।
পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বাড়ির পূর্ব পাশে প্রায় দেড়শ ফুট দূরে একটি পতিত ধানের জমি থেকে উদ্ধার করা হয় হানিফের মরদেহ। সেই দৃশ্য দেখে ভেঙে পড়েন স্বজনরা। পুরো এলাকায় নেমে আসে শোক, ক্ষোভ আর আতঙ্কের ছায়া।
নিহতের স্ত্রী আয়েশা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
আমার স্বামী বাঁচার জন্য আমাকে ফোন করেছিল। অনেক আকুতি-মিনতি করেছে। কিন্তু ওরা তাকে বাঁচতে দেয়নি। জাকির আমার স্বামীকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে। আমি এই হত্যার বিচার চাই, দোষীদের ফাঁসি চাই।”
বাবা ইব্রাহিম মিয়ার চোখেও তখন শুধু সন্তানের লাশ হারানোর অসহায়তা। তিনি বলেন, আমরা গিয়েও ছেলেকে বাঁচাতে পারিনি। তারা গেট খুলেনি। আমার ছেলেকে বাড়ির ভেতরেই হত্যা করা হয়েছে। পরে লাশ ফেলে রাখা হয় পাশের জমিতে। আমি আমার সন্তানের হত্যার বিচার চাই।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ জনতা বৃহস্পতিবার সকালে অভিযুক্তদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে বাড়ির ভেতর ও বাইরে থাকা একটি মোটরসাইকেলও পুড়ে যায়।
এদিকে পুলিশ অভিযুক্ত জাকির হোসেনকে না পেলেও তার মা, বাবা, বোন ও স্ত্রীসহ পাঁচজনকে আটক করেছে। কুলিয়ারচর থানার ওসি কাজী আরীফ উদ্দিন জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত জাকির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা, গরু চুরি ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ফরিদপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকায় তার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
এই হত্যাকাণ্ড যেন আবারও প্রশ্ন ছুড়ে দিল—
মাদকের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করবে কে?
আর কত হানিফ শেষ মুহূর্তে স্ত্রীকে ফোন করে জীবন ভিক্ষা চাইবে?
আর কত মা হারাবে সন্তান, কত স্ত্রী হারাবে স্বামী?
সরকার মাদকের বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” ঘোষণা দিলেও বাস্তবায়নের অভাবে গ্রামগঞ্জে এখনও সক্রিয় রয়েছে ভয়ংকর মাদক সিন্ডিকেট। যদি এখনই কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আরও হাজারো পরিবারকে এমন বুকফাটা কান্না বয়ে বেড়াতে হবে—আর রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে আরও অসংখ্য হানিফের জীবন।
