“Limited” আর “Ltd.”—নামের আড়ালে কি একই প্রতিষ্ঠানের দ্বৈত খেলা?
সরকারি ই-জিপি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেই দীর্ঘ এক দশক ধরে দুই ভিন্ন পরিচয়ে শত শত কোটি টাকার সরকারি কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান “Rangpur Metal Industries Limited” ও “Rangpur Metal Industries Ltd.”। অভিযোগ উঠেছে—নামের সামান্য পার্থক্যকে ঢাল বানিয়ে একই নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার, প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ, ভ্যাট-ট্যাক্স গোপন এবং একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করেছে।
এক হাজার কোটি টাকারও বেশি কাজ, একই নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগ ও সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দুই নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান দুটি অন্তত ২১৩টি সরকারি কার্যাদেশ পেয়েছে। এর মধ্যে “Rangpur Metal Industries Limited” নামে প্রায় ২৮৮ কোটি টাকা এবং “Rangpur Metal Industries Ltd.” নামে প্রায় ৭৭১ কোটি টাকার কাজ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৬০ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে একই মালিকানাধীন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।
প্রতিযোগিতার নামে ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা’?
অভিযোগকারীদের দাবি, একই প্রকল্পে দুই ভিন্ন নামে অংশ নিয়ে প্রতিযোগিতার কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করা হতো। বাইরে থেকে একাধিক দরদাতার উপস্থিতি দেখা গেলেও বাস্তবে উভয় প্রতিষ্ঠান একই নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে। ফলে প্রকৃত ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেননি এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আধিপত্য আরও শক্তিশালী হয়েছে।
একাধিক ঠিকাদারের ভাষ্য, “অনেক সময় টেন্ডারের শর্তই এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ যোগ্য না হয়। আবার একই প্রতিষ্ঠানের দুই নাম অংশ নেওয়ায় প্রতিযোগিতা দেখালেও কাজ আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে।
“Limited” বনাম “Ltd.” — সামান্য পার্থক্যে বড় প্রশ্ন-
সরকারি ই-জিপি রেকর্ডে দেখা গেছে, “Limited” ও “Ltd.” এই সামান্য পার্থক্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান দুটি আলাদা সত্তা হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়িক কাঠামো, অফিস ঠিকানা, পরিচালনা ব্যবস্থা, আর্থিক নথি ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে একই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভিযোগ উঠেছে, এই দ্বৈত পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে সরকারি কাজ ভাগিয়ে নেওয়া এবং ভ্যাট-ট্যাক্স সংক্রান্ত হিসাব জটিল করার উদ্দেশ্যে।
ভ্যাট সনদে অসঙ্গতি, টেন্ডারে প্রশ্ন-
অভিযোগে বলা হয়েছে, এক প্রতিষ্ঠানের নামে দরপত্র জমা দিলেও অন্য প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট সনদ ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে টেন্ডার আইডি ১০৬৩৬৯৯ ও ১০৬০৬৯৯-এর নথিতে এই অসঙ্গতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, “Rangpur Metal Industries Ltd.”-এর BIN ও ভ্যাট সনদ ব্যবহার করে “Rangpur Metal Industries Limited” নামে দরপত্র জমা দেওয়া হয়। এতে প্রকৃত আর্থিক হিসাব আড়াল করে কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
PPR লঙ্ঘনের অভিযোগ, তদন্তে জালিয়াতির আশঙ্কা
সরকারি ক্রয়বিধি বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ইউনিক e-GP Registration ID থাকার কথা। একই নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের একাধিক পরিচয়ে অংশগ্রহণ করলে তা Public Procurement Rules (PPR 2008)-এর Rule 127 ও Rule 128(1)-এর সরাসরি লঙ্ঘন হতে পারে। অর্থাৎ প্রতারণামূলক অংশগ্রহণ ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান—দুই অভিযোগই প্রযোজ্য হতে পারে।
একজন সাবেক প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞ বলেন, “ই-জিপির উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি একই প্রতিষ্ঠান ভিন্ন নামে অংশ নেয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
প্রকৌশলী-কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘অস্বচ্ছ সম্পর্ক’?
অভিযোগ আরও গুরুতর হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তারের দাবিকে কেন্দ্র করে। বিদ্যুৎ, পানি সম্পদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক কার্যক্রম রয়েছে। বিশেষ করে লিফট সরবরাহ ও স্থাপনের বড় বড় প্রকল্পে তাদের একচেটিয়া আধিপত্যের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কিছু প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে বিদেশ ভ্রমণ, কমিশন এবং আর্থিক সুবিধা দিয়ে প্রভাবিত করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো হয়নি, তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একাধিক প্রকল্পে জমা দেওয়া দুই প্রতিষ্ঠানের নথির ভাষা, ফরম্যাট ও আর্থিক উপস্থাপনায় “অস্বাভাবিক মিল” পাওয়া গেছে।
কর ফাঁকি ও আর্থিক গোপনের আশঙ্কা-
কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান ভিন্ন নামে কাজ করলেও যদি আর্থিক হিসাব আলাদা দেখানো হয়, তাহলে ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকির বড় সুযোগ তৈরি হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, বিপুল পরিমাণ সরকারি কাজের তুলনায় আর্থিক বিবরণীতে তার পূর্ণ প্রতিফলন নেই। ফলে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ আরও বড় হতে পারে।
RJSC ও e-GP নিবন্ধন নিয়েও প্রশ্ন-
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “Limited” ও “Ltd.” মূলত একই অর্থ বহন করে। তাই এত কাছাকাছি নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন কীভাবে অনুমোদন পেল, সেটিও বড় প্রশ্ন। অভিযোগ উঠেছে, নিবন্ধন ও যাচাই প্রক্রিয়ার দুর্বলতা—অথবা প্রভাব—এই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
দুদক, BPPA ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে-
সূত্র জানায়, অভিযোগের ভিত্তিতে BIN, TIN, RJSC নিবন্ধন, ব্যাংক লেনদেন, ভ্যাট রিটার্ন, e-GP কার্যক্রম ও গত এক দশকের কার্যাদেশ বিশ্লেষণের প্রস্তাব উঠেছে। তদন্ত শুরু হলে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে দেওয়া কার্যাদেশ পুনঃমূল্যায়নের আওতায় আসতে পারে।
“এটি শুধু অনিয়ম নয়, পুরো ব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা”
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এটি দেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ একই নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের দ্বৈত পরিচয়ে হাজার কোটি টাকার সরকারি কাজ নেওয়ার অভিযোগ শুধু একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে নয়—বরং পুরো ই-জিপি ব্যবস্থার কার্যকারিতা, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার ওপরই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
