সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) ও দরপত্রের শর্তকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একের পর এক কোটি কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন–এর বিরুদ্ধে। আর এই বিতর্কিত অনিয়মের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ডিএনসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম–এর নাম।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সড়কবাতির খুঁটি স্থাপন থেকে শুরু করে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে ওয়াকিটকি ক্রয়—সব মিলিয়ে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের দেওয়া কাজের পরিমাণ ছাড়িয়েছে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা।
অভিযোগ উঠেছে, দরপত্রের শর্ত বদল, অসম্পন্ন কাজের অভিজ্ঞতা দেখানো এবং বাজারদরের কয়েকগুণ বেশি দামে সরঞ্জাম কেনার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সরকারি অর্থ লুটপাটে জড়িত।
অসম্পন্ন কাজের সনদেই প্রোটোস্টারের ১৪ কোটি টাকার কাজ।
গত বছরের ২৫ আগস্ট মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত সড়কবাতির খুঁটি সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করেন সাইফুল ইসলাম। শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অন্তত ৫ বছরের অভিজ্ঞতা এবং গত ১০ বছরে ১০ কোটি ৮ লাখ টাকার একক কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার রেকর্ড দেখাতে হতো।
এই দরপত্রে অংশ নেয় জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান–এর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান প্রোটোস্টার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ১৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকার একটি কাজের অভিজ্ঞতা সনদ জমা দেয়। কিন্তু সেই সনদেই উল্লেখ ছিল, কাজটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত—অর্থাৎ দরপত্র জমার সময় কাজটি তখনও চলমান ও অসম্পন্ন।
পিপিআর অনুযায়ী এমন সনদ সরাসরি বাতিলযোগ্য হলেও অভিযোগ রয়েছে, সাইফুল ইসলামের যোগসাজশে মূল্যায়ন কমিটি বিষয়টি এড়িয়ে যায়। পরে সাধারণ সড়কবাতি প্রকল্পের ১৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার আরেকটি সনদ গ্রহণ করে প্রোটোস্টারকে যোগ্য ঘোষণা করা হয়। সবশেষে ৪ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
একই কৌশলে আরও ২১ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয় প্রোটোস্টার-
একই দিনে ডিএনসিসির অঞ্চল-৫–এর সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়া জাহাঙ্গীর গেট থেকে ফার্মগেট, বিজয় সরণি ও বিমানবন্দর সড়কে ডেকোরেটিভ স্ট্রিট লাইট পোল সরবরাহের আরেকটি দরপত্র আহ্বান করেন।
এখানে দরপত্রের শর্ত ছিল অন্তত ১৫ কোটি ৫ লাখ টাকার একক কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা। কিন্তু প্রোটোস্টার আবারও সেই অসম্পন্ন রাজশাহী প্রকল্পের সনদ এবং ডিএনসিসির ১৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার কাজের সনদ জমা দেয়—যা নির্ধারিত অভিজ্ঞতার চেয়ে প্রায় ৭০ লাখ টাকা কম।
এত বড় ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও দরপত্র যাচাই কমিটি গত ১৯ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেয় এবং ৪ ডিসেম্বর ২১ কোটি ১৯ লাখ টাকার চুক্তি সম্পন্ন হয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—দরপত্র কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা, নাকি আগে থেকেই ঠিক করা ছিল ঠিকাদারের নাম?
৪৭ হাজার টাকার ওয়াকিটকি কেনা হলো প্রায় ৩ লাখ টাকায়!
শুধু সড়কবাতি নয়, ওয়াকিটকি কেনাকাটাতেও ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নথি অনুযায়ী, ডিএনসিসি মোট ৩৮০টি ওয়াকিটকি কিনেছে প্রায় ৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকায়।
এর মধ্যে ‘হাইতেরা পিডিসি৬৮০’ মডেলের ১০০টি ওয়াকিটকির প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। অথচ ২০২৩ সালে বাংলাদেশ পুলিশ একই মডেলের ওয়াকিটকি কিনেছে মাত্র ৪৭ হাজার ৫২০ টাকায়।
একইভাবে ‘হাইতেরা এইচপি৭৮৮ ইউভি’ মডেলের ২৮০টি ওয়াকিটকির প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, যেখানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২০১৯ সালে একই ধরনের যন্ত্র কিনেছিল প্রায় ৫২ হাজার টাকায়।
অভিযোগ রয়েছে, বাজারমূল্য নির্ধারণে তিনটি ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠান—রুশদিয়া এন্টারপ্রাইজ, এসএম করপোরেশন এবং মেসার্স দ্য স্টেট আইটি লিমিটেড–এর কাছ থেকে কৃত্রিম দর সংগ্রহ করা হয়। তিনটি দরপত্রের ভাষা ও বিন্যাস হুবহু এক হওয়ায় যোগসাজশের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
জাল অভিজ্ঞতা সনদেও মিলেছে কোটি টাকার কাজ
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ৪ কোটি টাকার সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলেও ওয়াকিটকি সরবরাহের কাজ দেওয়া হয় মেসার্স দ্য স্টেট আইটি লিমিটেডকে। প্রতিষ্ঠানটি পুলিশ টেলিকম অর্গানাইজেশনের ১৩ কোটি টাকার একটি অভিজ্ঞতা সনদ জমা দেয়, যা মূলত চীনা প্রতিষ্ঠান Hytera Communications–এর নামে ইস্যু করা হয়েছিল।
পুলিশ টেলিকমের তৎকালীন এসপি এম আনোয়ার জাহিদ নিশ্চিত করেছেন, স্টেট আইটি সেখানে কেবল স্থানীয় এজেন্ট ছিল, প্রকৃত কাজের মালিক নয়। অথচ সেই সনদ ব্যবহার করেই কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই বিতর্কিত কার্যাদেশ অনুমোদন দেন সাইফুল ইসলাম নিজেই।
পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে মাঝপথে বদলে ফেলা হয় দরপত্রের শর্ত-
গত বছরের ১ জুন রামপুরা সেতু থেকে কুড়িল মোড় পর্যন্ত সড়কে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ের বৈদ্যুতিক কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু দরপত্র জমার মাত্র তিন দিন আগে, ২৬ জুন হঠাৎ করেই কারিগরি কমিটির অনুমোদন ছাড়াই শর্তে বড় পরিবর্তন আনা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জেএপি ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া, যার মালিকের সঙ্গে সাইফুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানের পণ্যের গুণগত সনদের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা, ইউরোপের নির্দিষ্ট বন্দর থেকে আমদানির শর্ত বাতিল এবং অস্বাভাবিকভাবে ‘সফটওয়্যার সোর্সকোড’ সরবরাহের শর্ত যুক্ত করে জেএপি ট্রেডিংকে ৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা বানানো হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি যে বাতি সরবরাহের প্রস্তাব দেয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তার দাম মাত্র ৬০ থেকে ৭০ ডলার—বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। অথচ প্রকল্পে প্রতিটি বাতির মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ টাকা!
পরবর্তীতে পণ্যের গুণগত ত্রুটি ও অনিয়মের অভিযোগে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) দরপত্রটি বাতিলের নির্দেশ দিলেও, গত ১৯ এপ্রিল তৃতীয়বারের মতো পুনরায় দরপত্র বাতিল করে একই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার নতুন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অস্বীকার, তদন্তের আশ্বাস-
সব অভিযোগ অস্বীকার করে সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন, সড়কবাতি, খুঁটি কিংবা ওয়াকিটকি কেনার ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি। তার ভাষ্য, “পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে চাইলে তিনবার দরপত্র আহ্বান করার প্রয়োজন হতো না।
অন্যদিকে অঞ্চল-৫–এর সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন জানিয়েছেন, উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
