শনিবার, ২৩শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজউকের শতকোটি টাকার জমি ঘিরে নতুন বিতর্ক ‘নিকেতন লেডিস পার্ক’—জনস্বার্থ,নাকি গোপন হস্তান্তরের ছক?

নিজস্ব প্রতিবেদক
মে ২২, ২০২৬ ১১:৪২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাজউকের ১৫০ কোটি টাকার জমিতে ‘নিকেতন লেডিস পার্ক’ কার স্বার্থে?

রাজধানীর অভিজাত গুলশান-নিকেতন এলাকায় রাজউকের প্রায় ১৫০ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন রহস্য ও বিতর্ক। জনকল্যাণের কথা বলে ‘পাবলিক পার্ক’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, শেষ পর্যন্ত সেই পার্ক একটি প্রভাবশালী হাউজিং সোসাইটির নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা এখন রাজউকের ভেতর-বাইরেই।

হাতিরঝিল ম্যানেজমেন্ট ভবনের পাশের প্রায় ২৭ কাঠার মূল্যবান প্লটে নির্মাণ করা হচ্ছে কথিত ‘নিকেতন লেডিস পার্ক’। অভিযোগ উঠেছে, পুরো প্রক্রিয়াটির পেছনে প্রভাব খাটিয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এমনকি রাজউকের জরুরি বোর্ড সভায় উপস্থিত থেকে তিনি নীতিগত অনুমোদন আদায়ে চাপ প্রয়োগ করেন বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতার আবহে অনুষ্ঠিত ওই সভা এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জানা গেছে, সভায় অনুমোদনের চাপ থাকলেও এখনো চূড়ান্ত রেজুলেশনে স্বাক্ষর করেননি কয়েকজন বোর্ড সদস্য।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বীর উত্তম মীর শওকত সড়কের নিকেতন হাউজিং সোসাইটির প্রবেশমুখের ঠিক পাশেই অবস্থিত বিশাল এই প্লট। দক্ষিণে হাতিরঝিল প্রকল্প, উত্তরে গুলশান-বনানী লেক—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা জমিটির কয়েক মিটার দূরেই রয়েছে শহীদ ডা. ফজলে রাব্বী পার্ক। তারপরও নতুন করে আরেকটি পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
প্লটের সড়কসংলগ্ন অংশজুড়ে উঁচু টিনের বেড়া দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে রাজউক। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমানে জায়গাটির চারপাশ টিনের উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘিরে রেখেছে রাজউক। সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সরকারি মালিকানার ঘোষণা দেওয়া হলেও ভেতরে চলছে হাতিরঝিল প্রকল্পের বর্জ্য ফেলার কাজ।

স্থানীয় চা বিক্রেতা ওহীদুল ইসলাম বলেন, আগে এই জায়গা লাল বাহিনীর দখলে ছিল। পরে সরকার এসে উদ্ধার করে। এখন শুনতেছি নিকেতনের জন্য পার্ক হবে।

আরেক দোকানি নিলুফা বেগমের ভাষ্য, এই জমি নিয়ে অনেক ঝামেলা হইছে। নিকেতন সোসাইটি আবার নিজেদের দাবি করে, রাজউকও বলে তাদের।
রাজউকের নথি ঘেঁটে জানা যায়, গত ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম বোর্ড সভায় ‘রাজউক নিকেতন লেক ভিউ পার্ক’ নির্মাণের প্রশাসনিক নীতিগত অনুমোদনের প্রস্তাব তোলা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন বিভাগের সদস্য ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা।

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকায় জমিটি পুনর্দখলের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি আধুনিক সবুজায়িত পাবলিক পার্ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্লটের সড়কসংলগ্ন অংশজুড়ে উঁচু টিনের বেড়ায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সাঁটানো নোটিশ। তোলা: ছবি

কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে মূল প্রশ্ন—জনস্বার্থের নামে নির্মিত পার্কটি আদৌ জনগণের জন্য থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে নিকেতন হাউজিং সোসাইটির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে?
রাজউকের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, এই জমি উদ্ধারে বছরের পর বছর মামলা, প্রভাবশালীদের চাপ এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে উদ্ধার হওয়া এই মূল্যবান সম্পদ এখন নতুন কৌশলে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার আয়োজন চলছে।

অভিযোগ আরও গুরুতর হয়েছে দুটি কারণে। প্রথমত, সরকারি নিয়ম ভেঙে সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের সরাসরি বোর্ড সভায় উপস্থিতি ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ। দ্বিতীয়ত, একই এলাকায় আগে থেকেই একটি বড় পার্ক থাকার পরও নতুন করে ‘লেডিস পার্ক’ নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। খুদে বার্তায় অভিযোগের বিস্তারিত পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এদিকে নথিতে উপস্থিতির প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন রাজউকের সাবেক সদস্য শেখ মতিয়ার রহমান। তিনি বলেন,
“বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আমি কোনো স্বাক্ষর করিনি।
রাজউকের উপপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান অবশ্য দাবি করেছেন, পার্কের মালিকানা রাজউকের কাছেই থাকবে। তার ভাষায়,
“নারীদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, পার্ক পরিচালনার নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যদিও ভবিষ্যতে নারীদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সবশেষে, পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এখন প্রশ্ন একটাই—রাজউকের উদ্ধার করা শতকোটি টাকার এই সরকারি জমি কি সত্যিই জনস্বার্থে ব্যবহৃত হবে, নাকি ‘লেডিস পার্ক’-এর আড়ালে শুরু হয়েছে নতুন কোনো প্রভাবশালী দখলবাণিজ্য?

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।