নতুন নামে ব্যবসা, পুরনো কৌশলে কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি—তদন্তের মাঝেই ফের আলোচনায় বিতর্কিত ঠিকাদার জাহের। ফাইল ছবি
স্বাস্থ্য খাতের বহুল আলোচিত ঠিকাদার ও বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানির মালিক জাহের উদ্দিন সরকারকে ঘিরে ফের নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক মামলা ও তদন্ত চলমান থাকলেও তিনি থেমে নেই—বরং নতুন নামে প্রতিষ্ঠান খুলে আবারও স্বাস্থ্য খাতের কোটি টাকার ব্যবসায় সক্রিয় রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, স্বাস্থ্য খাতে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আড়ালে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ল্যাবরেটরি আইটেম ও ওষুধ সরবরাহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন জাহের উদ্দিন। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে সরঞ্জাম সরবরাহের একাধিক কাজও তিনি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্বাস্থ্য খাতের ‘সিন্ডিকেট সাম্রাজ্য’ ঘিরে পুরনো অভিযোগ
বিগত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য খাতের ঠিকাদারি ব্যবস্থায় গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট নিয়ে যে বিতর্ক বারবার সামনে এসেছে, সেখানে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল জাহের উদ্দিন সরকারের প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠে আসে।
স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের কেনাকাটা, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই তদন্ত সংস্থা ও দুদকের নজরে রয়েছেন তিনি।
‘পলাতক’ নাকি পুরানাপল্টনে সক্রিয় ব্যবসায়ী?
দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, নথিপত্রে জাহের উদ্দিন সরকারকে পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে—তিনি দেশেই অবস্থান করছেন। শুধু তাই নয়, রাজধানীর পুরানাপল্টনে একটি কার্যালয় থেকে নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় তদন্ত সংশ্লিষ্ট মহলেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—দুদকের মামলার আসামি হয়েও কীভাবে তিনি প্রকাশ্যে ব্যবসা পরিচালনা করছেন?
যন্ত্রপাতির আড়ালে ‘সম্পদের পাহাড়’!
অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে যন্ত্রপাতি সরবরাহের নামে বছরের পর বছর অনিয়ম, জালিয়াতি ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন জাহের উদ্দিন সরকার। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের নামে দেশে-বিদেশে বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়ি ও বিপুল ব্যাংক আমানতের তথ্য রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান নথি অনুযায়ী, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি এবং আসবাবপত্র সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগে তাঁর মালিকানাধীন ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রিত একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—
বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানি
মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল
ইউনিভার্সেল ট্রেড করপোরেশন
১৩২ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ-
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজে ১৩২ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহ প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেই বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে। একই সঙ্গে শুল্ক ফাঁকির বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।
সাজানো দরপত্র, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি, কোটি টাকা আত্মসাৎ-
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০১৮ সালের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের দরপত্রেও জাহের উদ্দিন সরকারের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় বলে দুদকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, যোগসাজশের মাধ্যমে সাজানো দরপত্র তৈরি করে নিম্নমানের ও ব্যবহার অনুপযোগী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তদন্তে রয়েছে।
১৯ প্রকল্পে ৩০০ কোটি টাকার অনিয়ম-
দুদকের তথ্যমতে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের ১৯টি প্রকল্প ও হাসপাতালের কেনাকাটায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে জাহের উদ্দিন সরকার ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ১৬৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এসব ঘটনায় ইতোমধ্যে ১৯টি মামলা করেছে দুদক।
যেসব হাসপাতালের কেনাকাটা তদন্তে-
দুদকের তদন্তাধীন প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে—
* সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
* সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল
* রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
* পাবনার শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ
* চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল
তদন্ত চলছে, নীরব জাহের উদ্দিন-
পাবনার শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসংক্রান্ত একটি মামলায় ২০২০ সালের ৯ আগস্ট মামলা দায়ের করে দুদক। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাহের উদ্দিন সরকারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
