রবিবার, ৩০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্বস্তি নেই বাজারে, মধ্যবিত্তের সংসারে নিত্য টানাপোড়েন

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুন ৭, ২০২৬ ১২:৩২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলায় দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন নুর আলম। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে মাসে পান ৪৫ হাজার টাকা। কিন্তু সেই বেতন গত দুই বছরে এক টাকাও বাড়েনি। অন্যদিকে প্রতিদিন যেন নতুন করে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। ফলে মাসের শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে তিনি পড়ছেন চরম সংকটে।

গত মঙ্গলবার কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। নুর আলম জানান, দুই রুমের ফ্ল্যাটের ভাড়া ও ইউটিলিটি বিলেই চলে যায় ২০ হাজার টাকা। দুই সন্তানের স্কুল ফি ও যাতায়াতে আরও ৭ হাজার, নিজের অফিস যাতায়াতে ৩ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিলে পুরো মাসের খাবারের জন্য হাতে থাকে মাত্র ১৫ হাজার টাকা।

একসময় কিছুটা কম দামে বাজার করার আশায় ভোরে বছিলা থেকে কারওয়ান বাজারে ছুটে আসতেন তিনি। কিন্তু এখন সেই সুবিধাও নেই। ঢ্যাঁড়শ ছাড়া বেশিরভাগ সবজির দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। তিন মাসে মোটা মসুর ডালের কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা, এখন দাম ১০৫ টাকা। ভালো মানের ডাল কিনতে খরচ হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৮০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৭৫ থেকে ১৯০ টাকা, যা কয়েক মাস আগেও ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে। ভোজ্যতেলের লিটারে বেড়েছে অন্তত ১৫ টাকা। একইভাবে বেড়েছে ডিম, চিনি ও আদার দামও।

চিকিৎসার খরচে কমে যায় খাবারের তালিকা

চাকরির বেতনের বাইরে নুর আলমের কোনো আয়ের উৎস নেই। তাঁর ভাষায়,  এখন চারজনের ভরপেট খাওয়ানোই কঠিন হয়ে গেছে। প্রতি মাসে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

সম্প্রতি আট বছরের সন্তান হামে আক্রান্ত হলে চিকিৎসায় খরচ হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। সেই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে পরিবারের খাদ্যতালিকায় কাটছাঁট করতে হয়েছে। মাছ, ফল তো দূরের কথা, দুধ কেনাও বন্ধ রাখতে হয়েছে।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, জ্বর বা শরীর খারাপ হলে এখন ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সাহস পাই না। ফার্মেসি থেকে সস্তা প্যারাসিটামল কিনে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করি।

মাসের পর মাস ঘাটতি সামলাতে গিয়ে বহু কষ্টে জমানো ডিপিএসের দুই লাখ টাকাও ভেঙে ফেলেছেন তিনি। সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা জরুরি বিপদের জন্য রাখা শেষ সঞ্চয়টুকুও এখন শেষ।

নুর আলমের গল্প শুধু একজন মানুষের নয়; এটি দেশের অসংখ্য মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

১০০ দিনেও কমেনি বাজারের অস্থিরতা

বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন পার হয়েছে। এই সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা সংস্কার উদ্যোগ দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি—এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ক্রমেই কোণঠাসা করে তুলছে। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বৈষম্য, যার প্রভাব পড়ছে প্রতিটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে।

মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে দিশেহারা মানুষ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নামলেও এপ্রিলেই তা আবার বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

এর মধ্যে—

খাদ্য মূল্যস্ফীতি: ৮.৩৯ শতাংশ

খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি: ৯.৫৭ শতাংশ

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ—সব ক্ষেত্রেই খরচ বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের দামে।

বিদ্যুতের নতুন ধাক্কা

এলপিজির বাড়তি দামের চাপ সামলানোর আগেই গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় সব পণ্যের দামকে আরও উসকে দেবে।

আগারগাঁও কাঁচাবাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মাহবুবুল হাসান বলেন,

“আমাদের ঘাড়ে খরচের চাপ আরও বাড়ল। বাসার বিদ্যুৎ বিল দুই হাজার টাকার মতো আসে। এখন অন্তত ৩০০-৪০০ টাকা বেশি গুনতে হবে। ব্যবসায়ীরাও সুযোগ নিয়ে পণ্যের দাম বাড়াবে।”

অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা শাহ আলম সম্প্রতি বাসার জন্য একটি এসি কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধির খবর শুনে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।

তাঁর ভাষায়,

“এখন এসি কেনার চিন্তা বাদ দিয়েছি। সামনে হয়তো ফ্যানও হিসাব করে চালাতে হবে।”

সিন্ডিকেটের ছায়া এখনও অটুট

নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের বড় প্রত্যাশা ছিল বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা। সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং রাষ্ট্রীয় মজুত বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও খুচরা বাজারে এর দৃশ্যমান প্রভাব খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

অভিযোগ রয়েছে, বড় আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এখনও বহাল রয়েছে। খুচরা পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও মূল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কম দেখা যাচ্ছে।

এছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মহাসড়ক ও পাইকারি বাজারে চাঁদাবাজির ধরন বদলালেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে পরিবহন ব্যয়ও কমেনি।

ডলার সংকটের কারণে ছোট আমদানিকারকদের অনেকেই সময়মতো ঋণপত্র খুলতে না পারায় বড় আমদানিকারকরা বাজারে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে চিনি ও  ভোজ্যতেলের মতো পণ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

কঠোর পদক্ষেপের দাবি

অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভের চাপের কারণে রাতারাতি পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাদের মতে, শুধু খুচরা বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে লাভ হবে না। বরং কারওয়ান বাজার, খাতুনগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের মতো বড় পাইকারি কেন্দ্র এবং আমদানি-উৎপাদন পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মজুতদারির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

“লুটপাট বন্ধ করলেই চাপ কমবে”

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে নানা ধরনের অপচয়, চুরি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। পণ্য পরিবহনেও এখনও চাঁদাবাজি আছে। এসব বন্ধ করতে পারলে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হলেও দুর্বল বাজার তদারকির কারণে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের প্রকৃত স্বস্তি ফিরছে না।

মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি গ্রামে

ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা, বিনিময় হারের চাপ এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

এর সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ছে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র কৃষক, দিনমজুর এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।

শেষ কথা : সংখ্যার হিসাব হয়তো অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে, কিন্তু বাস্তবতার মুখ হলো নুর আলমের মতো মানুষরা। যাঁরা প্রতিদিন আয়-ব্যয়ের খাতায় নতুন করে বেঁচে থাকার অঙ্ক কষছেন। বাজারের প্রতিটি বাড়তি টাকার সঙ্গে কমে যাচ্ছে তাঁদের সঞ্চয়, পুষ্টি, চিকিৎসা আর ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। প্রশ্ন একটাই—দ্রব্যমূল্যের এই লাগামহীন দৌড়ের শেষ কোথায়?

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।