শনিবার, ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নিখোঁজ যুবকের সন্ধান দাবির মানববন্ধন ঘিরে সুন্দরবনে উত্তেজনা, কোস্টগার্ড স্টেশনে হামলা-ভাঙচুর, সংঘর্ষে আহত অন্তত ১৫

মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
জুন ১১, ২০২৬ ১১:১৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকায় বৃহস্পতিবার কোস্টগার্ড আউটপোস্টের পন্টুনে হামলা চালায় উত্তেজিত জনতা। ছবি : সংগৃহীত

নিখোঁজ এক যুবকের সন্ধান দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনকে কেন্দ্র করে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন চিলা ইউনিয়নের জয়মনির ঘোল এলাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে মানববন্ধনের একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সদস্যদের সংঘর্ষ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে কোস্টগার্ড সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।

ঘটনার পরপরই এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত কোস্টগার্ড, পুলিশ ও র‍্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এলাকায় শান্ত অবস্থা বিরাজ করছে।

মানববন্ধন থেকে সংঘর্ষ

স্থানীয় সূত্র জানায়, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নিখোঁজ যুবক মিরাজ শেখের সন্ধান দাবিতে তাঁর স্বজন ও এলাকাবাসী জয়মনির ঘোল এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। মানববন্ধন চলাকালে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ কোস্টগার্ডের হারবারিয়া চেকপোস্ট ও স্টেশনের দিকে অগ্রসর হয়।

অভিযোগ রয়েছে, তারা কোস্টগার্ড স্টেশনে হামলা চালিয়ে স্পিডবোট, পন্টুন অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও মালপত্র ভাঙচুর করে। এতে স্টেশনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন সদস্য আহত হন।

ব্ল্যাঙ্ক কার্টিজ নিক্ষেপ, ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় কোস্টগার্ড সদস্যদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাহিনীর সদস্যরা কয়েক রাউন্ড ব্ল্যাঙ্ক কার্টিজ নিক্ষেপ করেন। যদিও এসব কার্টিজে প্রাণঘাতী গুলি থাকে না, তবে গুলির মতো শব্দ সৃষ্টি হওয়ায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পরে অতিরিক্ত কোস্টগার্ড, পুলিশ ও র‍্যাব সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠিচার্জে নারী-পুরুষসহ অন্তত ১০ জন গ্রামবাসী আহত হয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। যদিও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছ থেকে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য

চিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গাজী আকবর হোসেন বলেন, ঘটনার সময় আমি এলাকায় ছিলাম না। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে কোস্টগার্ড স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুরের বিষয়টি জানতে পেরেছি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম জানান, ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। তখন পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত ছিল। আমি গ্রামবাসীদের শান্ত করার চেষ্টা করেছি।

তদন্ত শুরু, মামলার প্রস্তুতি

মো. আতিকুর রহমান বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ, কোস্টগার্ড ও র‍্যাব মোতায়েন রয়েছে।

তিনি জানান, সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো পক্ষ থানায় মামলা দায়ের করেনি। তবে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

কোস্টগার্ডের দাবি: পরিকল্পিত হামলার পেছনে স্বার্থান্বেষী মহল

ঘটনার পর বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সদরদপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জয়মনির ঘোল এলাকায় অবস্থিত কোস্টগার্ড স্টেশন হারবারিয়ায় একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বনদস্যু দমন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় কোস্টগার্ড টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।

কোস্টগার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, জয়মনির ঘোল দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের অন্যতম সক্রিয় ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এ কারণে সেখানে স্টেশন স্থাপন করা হয়। স্টেশন চালুর পর বনদস্যুদের কাছে রসদ, অস্ত্র ও অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রাথমিক তদন্ত ও স্থানীয় পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কোস্টগার্ডের ধারণা, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ও অসাধু চক্র নিজেদের অপকর্ম পরিচালনার সুবিধার্থে পরিকল্পিতভাবে হামলা, ভাঙচুর ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য সুন্দরবনে বনদস্যু দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোস্টগার্ডের চলমান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা এবং বাহিনীকে এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া।

যৌথ অভিযান শুরু

কোস্টগার্ড জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে ইতোমধ্যে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাহিনীর অভিযান ও দায়িত্ব পালন অব্যাহত থাকবে।

নিখোঁজ মিরাজ শেখকে ঘিরেই উত্তেজনার সূত্রপাত

উল্লেখ্য, জয়মনির ঘোল এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখ (৩২) গত ১০ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁর পরিবারের দাবি, কোস্টগার্ড পরিচয়ে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। এ অভিযোগের ভিত্তিতে স্বজনরা গত কয়েক মাস ধরে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁর সন্ধান দাবি করে আসছেন।

তবে কোস্টগার্ড শুরু থেকেই এ ঘটনায় তাদের কোনো সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

নিখোঁজ যুবকের রহস্য, স্থানীয়দের ক্ষোভ এবং কোস্টগার্ডের পাল্টা দাবির মধ্যে সুন্দরবন-সংলগ্ন জয়মনির ঘোল এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তদন্তের ফলাফল ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা। :::

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।