তথ্য গোপনের অভিযোগে তোলপাড় নগর ভবন, রাতারাতি ফাইল সরানোর গুঞ্জন। ফাইল ছবি
জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত একটি সিটি কর্পোরেশন যদি জনগণকেই তাদের অর্থের হিসাব দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে সেটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার জন্যও বড় ধরনের হুমকি। আর সেই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (জিসিসি) এবার পড়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধানের মুখে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক কঠোর পদক্ষেপে গাজীপুর নগর ভবনে সৃষ্টি হয়েছে চরম অস্বস্তি ও উদ্বেগ। সচেতন মহলের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের তদন্তের আঁচ টের পেয়েই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট তথ্য গোপন, নথি ধামাচাপা এবং আর্থিক অনিয়মের চিহ্ন মুছে ফেলার তৎপরতায় নেমেছে।
১৭ বছরের হিসাব চাইলো মন্ত্রণালয়
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১২ মে ২০২৬ তারিখে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (প্রশাসন-১ শাখা) থেকে স্মারক নম্বর: ৪৬.০০.০০০০.০৩৯.০১৮.০১৩.২০২৬-৮৮৪-এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদেশ জারি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছরের কার্যক্রমে অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক অসঙ্গতি খতিয়ে দেখতে ৭ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে দেশের সব সিটি কর্পোরেশনকে মাত্র ৭ কার্যদিবসের মধ্যে গত ১৭ বছরের দুর্নীতি, আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন (হার্ড ও সফটকপি) মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জরুরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নগর ভবনে ‘কাঁপন’, বেরিয়ে আসবে কি কোটি টাকার কেলেঙ্কারি?
মন্ত্রণালয়ের এই সাঁড়াশি অভিযানের মুখে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ভেতরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—
কোটি কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্যের নেপথ্যের কারা?
ভুয়া মাস্টাররোলের মাধ্যমে কারা অর্থ আত্মসাৎ করেছে?
প্রকল্প বরাদ্দ ও ঠিকাদারি বিলের নামে কত টাকা লোপাট হয়েছে?
প্রভাবশালী ‘রাঘববোয়ালদের’ নাম কি এবার প্রকাশ্যে আসবে?
নাকি অতীতের মতো আবারও ফাইল গায়েব, নথি উধাও আর প্রশাসনিক ধামাচাপার আড়ালে চাপা পড়ে যাবে পুরো ঘটনা?
তথ্য অধিকার আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি!
ঠিক যখন মন্ত্রণালয় ১৭ বছরের হিসাব চেয়ে আলটিমেটাম দিয়েছে, তখনই গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে শুরু হয়েছে তথ্য গোপনের অভিযোগ।
জানা গেছে, গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী নির্ধারিত ‘ফরম-ক’-এর মাধ্যমে এক গণমাধ্যমকর্মী গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন। আবেদনটির দাপ্তরিক ডেসপাস নম্বর-৭২৭।
আবেদনে চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল—
৫ আগস্ট ২০২৪ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের ব্যাংক ব্যালেন্স;
অবশিষ্ট তহবিলের পরিমাণ;
বিতর্কিত ঠিকাদারি বিলের তথ্য;
সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের অনুলিপি।
অভিযোগ উঠেছে, আবেদন গ্রহণ করা হলেও পরে তথ্য কর্মকর্তা আবেদনকারীকে ডেকে নিয়ে মৌখিকভাবে জানান—আপনি যে তথ্য চেয়েছেন, সেটি দেওয়া যাবে না। আপনি যা চেয়েছেন সেটা প্রশাসকও চান না।
এমনকি তিনি আবেদনকারীকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) কাছে যেতে বলেন।
আইন কী বলছে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থান সরাসরি তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ৯(১) ও ৯(৩)-এর পরিপন্থী।
আইন অনুযায়ী—
দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা নিজেই তথ্য প্রদানে বাধ্য;
তথ্য না দিলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে;
মৌখিকভাবে তথ্য প্রত্যাখ্যানের কোনো সুযোগ নেই;
সিইও বা প্রশাসকের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর তথ্য প্রদানের বিষয় নির্ভর করে না।
অর্থাৎ আবেদনকারীকে সিইওর কাছে পাঠানো তথ্য কর্মকর্তার নিজ দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার শামিল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কী এমন আছে সেই নথিতে?
স্থানীয়দের প্রশ্ন—জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও ঠিকাদারি বিলের তথ্য প্রকাশে এত ভয় কেন?
৫ আগস্ট ২০২৪ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ফান্ডের হিসাব ও কোটি কোটি টাকার বিল পরিশোধের তালিকায় এমন কী তথ্য রয়েছে, যা প্রকাশ পেলে প্রশাসনের ভিত নড়ে যেতে পারে?
ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত কমিটি মাঠে নামার আগেই ব্যাকডেটেড চেকের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলন এবং তহবিল শূন্য করার অপচেষ্টা চলছে। আর সেই কারণেই তথ্য কর্মকর্তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মূল আর্থিক নথি গোপন রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
আপিলের পথে আবেদনকারী
এ বিষয়ে আবেদনকারী গণমাধ্যমকর্মী বলেন—
আইন কোনো ব্যক্তি, সিইও কিংবা প্রশাসকের খেয়ালখুশিতে চলতে পারে না। সরকারি তহবিলের হিসাব জানার অধিকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। যেহেতু তারা মৌখিকভাবে তথ্য প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই তথ্য অধিকার আইনের ধারা ২৪ অনুযায়ী আমি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক আপিল করব।
এ বিষয়ে তথ্য কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এখন প্রশ্ন একটাই—
মন্ত্রণালয়ের ১৭ বছরের অনুসন্ধানে কি বেরিয়ে আসবে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের আর্থিক অনিয়মের গোপন অধ্যায়, নাকি আবারও অদৃশ্য হয়ে যাবে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আর আড়ালে থেকে যাবে রাঘববোয়ালরা?গাজীপুরবাসী এখন সেই উত্তর জানার অপেক্ষায়।
