৩৫০ কোটি টাকার সার গুদাম প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে পিডি মুজিবুর রহমান। ফাইল ছবি
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বাস্তবায়নাধীন “বিদ্যমান সার গুদামসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং নতুন গুদাম নির্মাণের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদারকরণ (দ্বিতীয় পর্যায়)” প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মো. মুজিবুর রহমানকে ঘিরে নানা অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন নির্মাণ ও সংস্কার কাজের দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কমিশন গ্রহণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
৩৫০ কোটি টাকার প্রকল্প, কিন্তু প্রশ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল সার সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন গুদাম নির্মাণ, পুরোনো গুদাম পুনর্বাসন এবং কৃষকের দোরগোড়ায় সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করা।
তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও প্রকল্পের শতভাগ কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। তাদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনা ও তদারকির ঘাটতির কারণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হয়েছে।
মিস্টার ১০ শতাংশ’—ঠিকাদার মহলে আলোচিত অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের বিপরীতে কমিশন গ্রহণের একটি অঘোষিত সংস্কৃতি চালু ছিল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে কাজের কার্যাদেশের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দাবি করা হতো।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. মুজিবুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগগুলোর স্বতন্ত্র প্রমাণও প্রকাশ্যে উপস্থাপিত হয়নি।
বিভিন্ন জেলায় নিম্নমানের কাজের অভিযোগ
সূত্রগুলো দাবি করেছে, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, সিরাজগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় গুদাম নির্মাণ ও সংস্কার কাজে অনিয়ম হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে—
রংপুরে প্রকল্পের কিছু কাজ অনুমোদিত পরিকল্পনার বাইরে বাস্তবায়ন করা হয়েছে;
দিনাজপুরের বিরামপুরে নির্মিত গুদামে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ রয়েছে;
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে নির্মাণকাজে দরপত্রের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ;
চুয়াডাঙ্গায় নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনে প্রশ্ন
প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল বিএডিসির নন-নাইট্রোজেনাস সার সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করা এবং সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা।
কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পের আওতায় দৃশ্যমান উন্নয়ন কার্যক্রম প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। ফলে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিএডিসির কয়েকজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, প্রকল্পের আওতায় সম্পাদিত কাজ, ব্যয় এবং দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে সেটিও আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করা প্রয়োজন, যাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে বিদ্যমান বিতর্কের একটি সুষ্ঠু অবসান ঘটে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. মুজিবুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া গেলে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা দিলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
