ফাইল ছবি
প্রশাসনে একযোগে ১৭৯ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার পর শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। পদোন্নতির তালিকায় স্থান পেয়েছেন অবসরে পাঠানো কর্মকর্তা, অতীতে দুর্নীতি ও অসদাচরণের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং বিভাগীয় তদন্তের মুখোমুখি কর্মকর্তারাও। একই সঙ্গে মেধাতালিকার শীর্ষে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা বাদ পড়ায় সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন।
বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পান ১৭৯ কর্মকর্তা। তালিকার ৫৩ নম্বরে রয়েছে উপসচিব মাইনুল হক ভূঁইয়ার নাম, যাকে এর মাত্র ৯ দিন আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল।
অবসরের ৯ দিন পরই যুগ্ম সচিব
গত ৩০ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের উপসচিব মাইনুল হক ভূঁইয়াকে বয়স ৫৯ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি চাকরি আইনের ধারা ৪৩(১)(ক) অনুযায়ী অবসরে পাঠানো হয়। অথচ একই মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপনে তিনি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র কৌতূহল। সরকারিভাবে এখনও এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
মাইনুল হক ভূঁইয়া বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জেনেশুনেই আমাকে পদোন্নতি দিয়েছে। এটি ভুলবশত হয়নি। যেহেতু অবসরের প্রজ্ঞাপনও একই মন্ত্রণালয় দিয়েছে, তাই হয়তো পরে আরেকটি প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি পরিষ্কার করা হবে। তবে এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত কিছু জানি না।
দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও পদোন্নতির তালিকায়
এবারের পদোন্নতির তালিকায় রয়েছেন অতীতে বিভাগীয় শাস্তিপ্রাপ্ত একাধিক কর্মকর্তাও। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত উপসচিব মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, ডেমরার সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে অসদাচরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিন বছরের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদণ্ড পেয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করেও সেই দণ্ড বহাল ছিল।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব মো. শাহীনুর ইসলাম নীলফামারীতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) থাকাকালে তিস্তা নদীর বালুমহাল-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে বিভাগীয় মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন। তাঁকে এক বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিত করা হয়েছিল। তিনিও এবার যুগ্ম সচিব হয়েছেন।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ মকবুল হোসেন রংপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে কর্মরত অবস্থায় নির্মাণকাজে দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগে দুই বছরের জন্য দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের শাস্তি পান। পরে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল সেই দণ্ড বাতিল করে। তিনিও পদোন্নতিপ্রাপ্তদের তালিকায় রয়েছেন।
বরখাস্ত কর্মকর্তা থেকেও পদোন্নতি
কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে অবহেলার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ২৮ মে বরখাস্ত হওয়া উপসচিব ছাদেকুর রহমানও এবার যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলছিল এবং বর্তমানে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি (সংযুক্ত) হিসেবে রয়েছেন।
এ বিষয়ে ছাদেকুর রহমান বলেন, আমার বিষয়ে তদন্ত হয়েছে এবং শুনানি শেষে জনপ্রশাসন সচিব বিষয়টি নিষ্পত্তি করেছেন।
তবে এখনও ওএসডি হিসেবে কেন রয়েছেন—এ প্রশ্নের জবাব তিনি দেননি।
মেধাতালিকার শীর্ষ কর্মকর্তারা বাদ
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার ২৪ ও ২৫ ব্যাচের বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং অতীতে বঞ্চিতদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
তবে বিস্ময়ের বিষয়, ২৫ ব্যাচের মেধাতালিকার প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দুই কর্মকর্তা পদোন্নতি পাননি, যা প্রশাসনের ভেতরে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এসএসবির বাছাই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন
উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদোন্নতির সুপারিশ করে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)। প্রায় আট মাস ধরে যাচাই-বাছাই শেষে এ কমিটি পদোন্নতির সুপারিশ করে, যা পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও অর্থ বিভাগের সচিব বা জ্যেষ্ঠ সচিব এবং মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এ বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহছানুল হককে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী পদোন্নতির তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞের মত
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, অবসরে যাওয়া কোনো কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে পুরো পদোন্নতি প্রক্রিয়াই বিতর্কের মুখে পড়েছে। এতে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে এসএসবি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায় রয়েছে। সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্বচ্ছতা ও আইনি ব্যাখ্যার দাবি
প্রশাসন-সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পদোন্নতি শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়; এটি প্রশাসনের ন্যায্যতা, শৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই অবসরে পাঠানো কর্মকর্তা কিংবা অতীতে দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির মতো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আইনি ভিত্তি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি, যাতে প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা অটুট থাকে।
