নিজ জেলা ও স্বামী-স্ত্রীর জেলায় পদায়ন নিষিদ্ধের সরকারি নির্দেশ কি কেবল কাগজেই? প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও সুশাসন নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন। ফাইল ছবি
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-তে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক তদবির, প্রশাসনিক প্রভাব এবং স্থানীয় লবিংয়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের অবসান ঘটিয়ে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সম্প্রতি কঠোর নীতিমালা জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। কিন্তু সেই নীতিমালা কার্যকরের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই তা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারের নতুন নির্দেশনা কি বাস্তবে কার্যকর, নাকি কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ?
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এলজিইডি সদর দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) জাহানারা পারভীন।
গত ১৬ জুলাই জারি হওয়া এক অফিস আদেশে তাকে টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়। অথচ সরকারি চাকরির রেকর্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী তার স্থায়ী ঠিকানা টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলা। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি এবং তার স্বামী—উভয়েই টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা।
ফলে সরকারি প্রজ্ঞাপনের আলোকে তার এই পদায়ন বৈধ কি না, তা নিয়ে প্রশাসনিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা।
প্রজ্ঞাপনে কী বলা হয়েছে?
গত ২ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগ বদলি ও পদায়ন সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞাপন জারি করে।
ওই প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়—
. কোনো কর্মকর্তাকে তার নিজ জেলায় পদায়ন করা যাবে না।
. কোনো কর্মকর্তাকে স্বামী বা স্ত্রীর নিজ জেলায়ও পদায়ন করা যাবে না।
. একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার সুযোগ সীমিত করতে হবে।
. নির্দিষ্ট সময় পর বাধ্যতামূলক বদলি নিশ্চিত করতে হবে।
. প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, আত্মীয়স্বজনের চাপ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং স্বার্থের সংঘাত থেকে কর্মকর্তাদের দূরে রেখে উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করা।
কেন নিজ জেলায় পদায়ন নিরুৎসাহিত করা হয়?
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন কর্মকর্তা নিজ জেলায় দায়িত্ব পালন করলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, আত্মীয়স্বজন, ব্যবসায়ী কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপ ও প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এর ফলে—
* উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন,
* দরপত্র প্রক্রিয়া,
* ঠিকাদার নিয়োগ,
* কাজের তদারকি,
* বিল পরিশোধ,
* প্রকল্প বাস্তবায়ন
—এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এ কারণেই সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নিজ জেলা কিংবা স্বামী বা স্ত্রীর জেলায় পদায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়নের দায়িত্ব এলজিইডির
এলজিইডি দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন বাস্তবায়নকারী সংস্থা।
প্রতিবছর প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে— সড়ক, সেতু, কালভার্ট, গ্রামীণ অবকাঠামো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা অবকাঠামোসহ হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
ফলে এই প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাদের পদায়ন শুধুমাত্র প্রশাসনিক বিষয় নয়; বরং সরকারি অর্থের সুশাসন, জবাবদিহি এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের সঙ্গেও এটি সরাসরি সম্পর্কিত।
দুই সপ্তাহেই নীতিমালার ব্যতিক্রম কেন?
নীতিমালা জারির মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে নিজ জেলায় পদায়নের ঘটনায় প্রশাসনিক মহলে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন নীতিমালা কার্যকরের আগেই কেন ব্যতিক্রম সৃষ্টি হলো?
যদি ব্যতিক্রমের সুযোগ থেকেই থাকে, তাহলে তার লিখিত অনুমোদন কোথায়?
কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?
সেই ব্যাখ্যা কেন প্রকাশ করা হয়নি?
এসব প্রশ্নের এখনো কোনো সুস্পষ্ট সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এর আগেও বাতিল হয়েছিল একই ধরনের পদায়ন
এটি এলজিইডিতে প্রথম বিতর্কিত পদায়নের ঘটনা নয়।
এর আগে—
লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওসার আলমকে নিজ জেলায় পদায়ন করা হয়েছিল।
নারায়ণগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসানুজ্জামানকেও একইভাবে নিজ জেলায় পদায়ন করা হয়।
পরবর্তীতে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে এবং প্রশাসনিক সমালোচনার মুখে দুটি আদেশই বাতিল করা হয়।
ফলে এবার প্রশ্ন উঠেছে—
একই ধরনের পরিস্থিতিতে জাহানারা পারভীনের পদায়ন বহাল থাকছে কেন?
একই নীতিমালার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
অদৃশ্য প্রভাবের অভিযোগ
এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই অদৃশ্য প্রভাব, রাজনৈতিক তদবির এবং প্রশাসনিক লবিংয়ের সংস্কৃতি চলে আসছে।
তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ জেলা কিংবা বড় উন্নয়ন প্রকল্পসমৃদ্ধ এলাকায় পদায়ন পেতে অনেক সময় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হয়।
ফলে অনেক ক্ষেত্রে নীতিমালা ও যোগ্যতার চেয়ে প্রভাবশালী মহলের সুপারিশই বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে বলে মাঠপর্যায়ে ধারণা রয়েছে।
কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, জাহানারা পারভীনের ক্ষেত্রেও কোনো বিশেষ প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জাহানারা পারভীনের বক্তব্য
নিজ জেলায় পদায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহানারা পারভীন বলেন, আমি এবং আমার স্বামী—দুজনই টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা।
তবে নতুন সরকারি নীতিমালার সঙ্গে তার পদায়নের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে তিনি রাজি হননি।
প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. বেলাল হোসেন বলেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর নির্দেশে বদলির আদেশ হয়েছে। আমি নিজ উদ্যোগে কোনো বদলি করিনি এবং কোনো বদলিও বাতিল করিনি। প্রমাণ ছাড়া আমি কোনো কাজ করি না। তাই অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
তবে এই পদায়ন সরকারি প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর তিনি দেননি।
প্রশাসন বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, কোনো নতুন নীতিমালা জারির পর তার প্রথম কয়েকটি বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, সেখান থেকেই বোঝা যায় সরকার সেই নীতিমালা বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক।
তাদের মতে, যদি একই ধরনের ঘটনায় একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, আর অন্যজনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়, তাহলে পুরো সংস্কার উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এখন সবার সামনে বড় প্রশ্ন
সবশেষে প্রশাসনিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
সরকার যে নীতিমালায় নিজ জেলা এবং স্বামী বা স্ত্রীর জেলায় পদায়ন নিষিদ্ধ করেছে, সেই বিধান কি বাস্তবেই সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে?
নাকি প্রভাব, ক্ষমতা কিংবা বিশেষ বিবেচনার ভিত্তিতে একই নীতিমালার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হবে?
প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রশ্নের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তরই নির্ধারণ করবে এলজিইডির বদলি-পদায়ন ব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবে কতটা সফল হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, প্রতিবেদনে উল্লেখিত, নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে নতুন কোনো তথ্যের ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে যথাযথভাবে সংযোজন করা হবে।
