এই ঘনিষ্ঠ দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ছবি: সংগৃহীত
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে একের পর এক ভিডিও, দ্বিতীয় বিয়ের দাবি এবং পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি তরুণীর সঙ্গে তার কথিত ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সাধারণ মানুষের আলোচনায় উঠে এসেছে এমপির নীতি-নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন।
প্রথমদিকে ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করা হলেও পরে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার জানায়, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি নয়; বরং এটি বাস্তব ভিডিও। এরপরই ঘটনাপ্রবাহ নতুন মোড় নেয়। ভাইরাল তরুণীকে এমপির দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করা হয়। কিন্তু বিয়ের স্থান, সময় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে একাধিক অসংগতি সামনে আসায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরও কয়েকটি ভিডিওতে একটি কক্ষে ওই তরুণীর সঙ্গে এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে দেখা যায়। একটি ভিডিওতে তাকে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতেও দেখা যায়। অন্য একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাদের একসঙ্গে অবস্থানের দৃশ্যও প্রকাশ্যে আসে। ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে প্রথমে এগুলোকে এআই-নির্মিত ভুয়া ভিডিও বলে দাবি করা হলেও পরবর্তীতে দলীয় অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যায়।
বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি জীবনবৃত্তান্ত (বায়োডাটা)। সেখানে দেখা যায়, কথিত বিয়ের মাত্র পাঁচ দিন পর, অর্থাৎ ২২ জুন তারিখে মরিয়ম খাতুন নিজেকে ‘অবিবাহিত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই বায়োডাটায় সচিব বরাবর এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ‘জোর সুপারিশ’ লিখে স্বাক্ষর রয়েছে বলেও দাবি উঠেছে। নথিতে মরিয়মের জন্মতারিখ ২২ মে ২০০৮ উল্লেখ থাকায় বয়স, বৈবাহিক অবস্থা এবং বিয়ের দাবিকে ঘিরে নতুন করে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া দীর্ঘ এক বিবৃতিতে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে পারিবারিকভাবে মরিয়ম খাতুনকে তিনি বিয়ে করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৩ জুলাই ঢাকার মগবাজারে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালে তার গাড়িচালক ও মরিয়মের মামা গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে গিয়ে কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে আসেন। পরে তারা কক্ষে প্রবেশ করে তাদের জিম্মি করেন, টাকা আদায় করেন এবং আরও অর্থ দাবি করেন। দাবি পূরণ না হওয়ায় ব্যক্তিগত গোপন মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি পুরো ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত চক্রান্ত’ বলে দাবি করেছেন।
ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও চলছে ব্যাপক আলোচনা। ভাইরাল ভিডিও, দ্বিতীয় বিয়ের দাবি, পরিবারগুলোর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, চাকরির সুপারিশসংবলিত বায়োডাটা এবং এমপির নিজস্ব ব্যাখ্যা, সব মিলিয়ে সাতক্ষীরার এই ‘এমপিকাণ্ড’ এখন দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য যাচাই করে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এই বিয়ে হয়েছে। তিনি আরও জানান, তরুণীর বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে হলেও তার পরিবার বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছে।
এদিকে ভাইরাল ভিডিও নিয়ে মরিয়ম খাতুন নামে ওই তরুণী এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে এবং সেটি সম্পূর্ণ বৈধ। তবে তার এই বক্তব্যের সঙ্গে পরিবারের দেওয়া তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ একটি ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাকে জানান, বিয়েটি ঢাকার মগবাজারে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে মরিয়ম তার পরবর্তী ভিডিও বার্তায় বিয়ের স্থান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এমপির প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামও ভিডিও বার্তায় দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, তিনি বিষয়টি জানতেন এবং এতে তার সম্মতি ছিল। তবে একই সময়ে ভাইরাল হওয়া হোটেলে এমপির ক্ষমা চাওয়ার ভিডিও এবং বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পুরো ঘটনাকে আরও রহস্যময় ও বিতর্কিত করে তুলেছে।
