বন্ধ শিল্প-কারখানা চালু, ন্যায্য মজুরি ও শ্রমিক অধিকার নিশ্চিতের জোর দাবি। ছবি সংগৃহীত
শ্রমিক শোষণ, অন্যায় ছাঁটাই, দমন-পীড়ন ও হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে রাজধানীতে সম্মেলন করেছে গার্মেন্টস শ্রমিক জোট-বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শিল্প-কারখানা দ্রুত চালু, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের দাবিতে উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকালে রাজধানীর শহীদ কর্নেল তাহের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল থেকে আগত শ্রমিক প্রতিনিধি, শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মী, শ্রম অধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের আমন্ত্রিত অতিথিরা অংশ নেন।
সম্মেলন সঞ্চালনা করেন এম এ সালাম, সাধারণ সম্পাদক, গার্মেন্টস শ্রমিক জোট-বাংলাদেশ। সভাপতিত্ব করেন নাঈমুল হাসান জুয়েল, সভাপতি, গার্মেন্টস শ্রমিক জোট-বাংলাদেশ এবং মেজবাহ উদ্দিন আহম্মেদ, চেয়ারম্যান, এনসিসিডব্লিউআই।
শিল্পখাতে বাড়ছে সংকট, অনিশ্চয়তায় শ্রমিক জীবন
সম্মেলনের শুরুতেই দেশের শিল্পখাতের বর্তমান পরিস্থিতি, শ্রমিকদের বহুমাত্রিক সংকট এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় অন্যায় ছাঁটাই, বকেয়া মজুরি, শ্রমিক নির্যাতন এবং ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে হাজারো শ্রমিক ও তাদের পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প হলেও এই খাতের শ্রমিকরা এখনও ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শ্রম আইনে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে দমন-পীড়ন ও হয়রানির সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে শিল্পখাতে অস্থিরতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
যে দাবিগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরা হলো। সম্মেলনে বক্তারা শ্রমিকদের স্বার্থে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—
* অন্যায়ভাবে শ্রমিক ছাঁটাই অবিলম্বে বন্ধ করা।
* শ্রমিকদের ওপর সব ধরনের দমন-পীড়ন ও হয়রানি বন্ধ করা।
* দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্প-কারখানা দ্রুত চালু করা।
* শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
* শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা।
* ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করা।
* ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
‘শ্রমিকবান্ধব নীতি ছাড়া শিল্পখাত টেকসই হবে না’
আয়োজকদের মতে, দেশের শিল্পখাতকে টেকসই ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম রাখতে হলে শ্রমিকবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং শ্রমিক-মালিকের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সুসম্পর্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। তারা বলেন, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে, শিল্পে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হবে।
সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আহ্বান
সম্মেলনে উপস্থিত বক্তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) এবং মালিকপক্ষের প্রতি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি কর্মসূচি ঘোষণার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানানো হয়। অংশগ্রহণকারীরা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনসহ সকল পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে রাজধানীর এই সম্মেলন নতুন করে শ্রমজীবী মানুষের দাবি-দাওয়াকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
