রবিবার, ২৬শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

৬ হাজার কোটি টাকার গ্রিড প্রকল্পে চাঞ্চল্যকর অনিয়ম: প্রাক্কলন ছাড়াই ২,২১৫ কোটি টাকার চুক্তি, অডিট আপত্তি আড়াই হাজার কোটি

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ২৬, ২০২৬ ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রিড সংকলন প্রকল্পে সরকারি ক্রয়বিধি উপেক্ষা করে বাজারদর যাচাই ও দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়াই ২ হাজার ২১৪ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার টাকার সাতটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি প্রকল্পজুড়ে আর্থিক অনিয়ম, কারিগরি ত্রুটি, অডিট আপত্তি, জনবল সংকট এবং কাজের ধীরগতিতে জাতীয় গ্রিডের নিরাপত্তা ও সরকারি অর্থ ব্যয় নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব উদ্বেগজনক তথ্য।

প্রাক্কলন ছাড়াই হাজার কোটি টাকার চুক্তি

সরকারি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) অনুযায়ী, দরপত্র আহ্বানের আগে বাজারদর যাচাই করে দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রস্তুত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেই বিধান উপেক্ষা করে সাতটি আন্তর্জাতিক প্যাকেজের আওতায় ২ হাজার ২১৪ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার টাকার চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে।

প্রাক্কলন না থাকায় প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে কাজ দেওয়া হয়েছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি।

একটি প্যাকেজেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় ৫৪৮ কোটি টাকা

প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজ-৮-এর কাজ পেয়েছিল এনার্জিপ্যাক-সিমেন্স-এনসিসিএল কনসোর্টিয়াম। ৫২৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকার এই চুক্তি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতায় বাতিল করতে হয়।

পুনরায় দরপত্র আহ্বানের পর একই কাজের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, অর্থাৎ একটি প্যাকেজেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয় ৫৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

এর ফলে সংশ্লিষ্ট সঞ্চালন লাইন চালু করা সম্ভব হচ্ছে না এবং দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় থাকায় সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমইডি।

পরীক্ষা ছাড়াই ৪৬ কোটি টাকার বিল পরিশোধ

বিদ্যুৎ সঞ্চালন সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ফ্যাক্টরি একসেপ্টেন্স টেস্ট (FAT) ছাড়াই ঠিকাদারকে ৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

আইএমইডির মতে, পরীক্ষা ছাড়া সংবেদনশীল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম গ্রিডে যুক্ত হলে ভবিষ্যতে যান্ত্রিক ত্রুটি, অগ্নিকাণ্ড কিংবা ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের মতো বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অনুমতি ছাড়াই কেনা হয়েছে ২ কোটি টাকার ড্রোন

প্রকল্পে ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ড্রোন কেনা হলেও প্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রেশন ও উড্ডয়ন অনুমতি নেওয়া হয়নি। ফলে এসব ড্রোন ব্যবহারে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

এছাড়া চুক্তিতে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি মালামাল আমদানির মাধ্যমে আরও ৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে।

আড়াই হাজার কোটির বেশি অডিট আপত্তি

২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে ২৫টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ ২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

অডিটে আরও উঠে এসেছে—

* বাস্তব ব্যয় ও লোন ফাইন্যান্সিয়াল ইনফরমেশন সিস্টেমে ৮৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকার গরমিল।

* নথিপত্র ছাড়াই ৫৬ কোটি ৯১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা অর্থছাড়।

* সরকারি কোষাগারে ৩৮ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকা সুদ জমা না দেওয়া।

* বরাদ্দের অতিরিক্ত ২৫ কোটি ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয়।

* ভ্যারিয়েশন অর্ডার ছাড়া ২০ কোটি ৪২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয়।

* ভূমি অধিগ্রহণে ১৩ কোটি ৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা সমন্বয়হীন ব্যয়।

* ট্রান্সফরমার অয়েল পরীক্ষা, আমদানি ও বিল পরিশোধে ১২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকার অনিয়ম।

* জনবল সংকট ও প্রকল্পে ধীরগতি

প্রকল্পের অনুমোদিত ৮৭টি পদের মধ্যে ৫২টি শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে প্রকৌশলী ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের ৫৯ শতাংশ পদ খালি, যার ফলে মাঠপর্যায়ের তদারকি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয়েছে।

আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল ৭৮ শতাংশ, কিন্তু অর্জিত হয়েছে মাত্র ৬১ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতিও সীমাবদ্ধ রয়েছে ৫৫ দশমিক ২৪ শতাংশে।

চারবার বদল হয়েছে প্রকল্প পরিচালক

২০১৯ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পে এখন পর্যন্ত চারবার প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন হয়েছে। ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল বাস্তবায়ন সময়সীমা ছিল জুন ২০২৪ পর্যন্ত। কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত করা হয়েছে।

অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন

৫ হাজার ৯৪৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)।

অর্থায়নের উৎস:

. সরকারের নিজস্ব তহবিল: ১ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা

. এডিবি ও এআইআইবি ঋণ: ৪ হাজার ২১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা

. পিজিসিবির নিজস্ব তহবিল: ৩২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা

আইএমইডির সুপারিশ

আইএমইডি প্রকল্পের ব্যয় ও সময় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে প্রাক্কলন ছাড়া চুক্তি, কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া বিল পরিশোধ এবং অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তিগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

প্রাক্কলন ছাড়া চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ফরজুল কবির বলেন, এ ধরনের কিছু হয়নি। তবে এ বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অন্যদিকে, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।