চেয়ারম্যান আলী হোসেন প্রধানিয়া ও এমডির বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, অতিরিক্ত ব্যয়, সুশাসন লঙ্ঘন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রশ্ন; অভিযোগ অস্বীকার এমডির। ফাইল ছবি
দেশের চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অন্যতম এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসিকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, করপোরেট সুশাসন লঙ্ঘন, অতিরিক্ত ব্যয়, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, শেয়ারহোল্ডারদের অংশগ্রহণ সীমিত করা এবং ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতির মতো নানা অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. তৌহিদুল আলম খান-এর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ মার্চ কোনো কারণ ছাড়াই এনআরবিসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়। অথচ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিধান অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে এক-পঞ্চমাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক থাকার কথা। অভিযোগকারীদের দাবি, পুরো বোর্ড স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে গঠন করায় করপোরেট সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নতুন বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকের আমানত ছিল প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা, ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং খেলাপি ঋণের হার ছিল ৫ শতাংশের নিচে। সে সময় আর্থিক সূচকে ব্যাংকটি চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। তবে অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নতুন বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো বক্তব্য, কর্মকর্তাদের প্রতি অবিশ্বাস এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে।
অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এবং বোর্ড সভায় কর্মকর্তাদের প্রমাণ ছাড়াই ‘চোর’ বলে সম্বোধন করেছেন। এতে কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় অস্বাভাবিক সংখ্যক বোর্ড সভা আয়োজনের অভিযোগও রয়েছে। জানা গেছে, গত এক বছরে ৩৩টি বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি সভায় সম্মানী, আপ্যায়ন ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সাব-কমিটির সভা বাড়িয়ে অতিরিক্ত সম্মানী নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। শুরুতে পরিচালকদের বোর্ড সভার সম্মানী ১০ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা করা হলেও পরে সমালোচনার মুখে তা আবার ১০ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, চেয়ারম্যানের জন্য প্রায় আট লাখ টাকা ব্যয়ে বাথরুম সংস্কার, প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি কেনার উদ্যোগ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত ব্যয় এবং ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে বিজনেস কনফারেন্স আয়োজন করে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি ১০টি নতুন গাড়ি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার প্রতিটির মূল্য ৪৩ লাখ টাকা বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্যাংকটির কয়েকজন বড় শেয়ারহোল্ডারের অভিযোগ, ২০২৫ সালের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) এমনভাবে আয়োজন করা হয় যাতে প্রকৃত শেয়ারহোল্ডাররা অংশ নিতে না পারেন। পরিচালক নির্বাচন সংক্রান্ত এজেন্ডা বাদ দেওয়া, আমন্ত্রণপত্র যথাসময়ে না পাঠানো এবং অখ্যাত পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
বর্তমান এমডির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করে নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ডিএমডি, সিএফও, সিএইচআরও, সিএলও এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রধানসহ বিভিন্ন পদে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। চেয়ারম্যান নিজের ঘনিষ্ঠ একজনকে পদোন্নতি দিয়ে উচ্চ বেতনে নিয়োগ দিয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কমিশন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত দুই মাসে ব্যাংকটি প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার আমানত হারিয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালন মুনাফাও কমেছে। আগের বছরে যেখানে পরিচালন মুনাফা ছিল প্রায় ৮০০ কোটি টাকা, সেখানে বর্তমান বোর্ডের অধীনে তা কমে ৪৫৭ কোটিতে নেমে এসেছে। কর্মকর্তাদের দাবি, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও গ্রাহকদের আস্থা কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এনআরবিসি ব্যাংক আরও বড় সংকটে পড়তে পারে। তারা প্রকৃত উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ব্যাংকে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়াকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. তৌহিদুল আলম খান অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিষয়ে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। ২০২৫ সালে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পর নতুন যে বোর্ড গঠন করা হয়েছে, সেই বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে। এখানে কোনো অনিয়ম বা ব্যত্যয়ের প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি আরও বলেন, বোর্ড সভার সম্মানীর পরিমাণ একসময় পরিবর্তন করা হলেও পরে তা আবার ১০ হাজার টাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এনআরবিসি সিকিউরিটিজের বিষয়ে তিনি জানান, এটি একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান এবং এর নিজস্ব চেয়ারম্যান রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের গাড়ি কেনা এবং চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত কাজে ব্যাংকের অর্থে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব অভিযোগের সত্যতা কোনো আদালত বা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তে এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
