কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নকল সিগারেট তৈরির কারখানায় অভিযানকে ঘিরে জব্দ করা মালামালের হিসাব নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযানের সময় প্রায় ২০ লাখ শলাকা নকল সিগারেট ও বিভিন্ন সরঞ্জামসহ প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল জব্দের কথা জানানো হলেও, একই রাতে দায়ের করা মামলার এজাহারে জব্দ তালিকায় দেখানো হয়েছে মাত্র ২৫ হাজার শলাকা সিগারেট ও ২৫ বস্তা তামাক, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় তিন লাখ টাকা।
অভিযানের হিসাব ও মামলার জব্দ তালিকার মধ্যে প্রায় এক কোটি ৯৭ লাখ টাকার বিশাল ব্যবধান কীভাবে তৈরি হলো—এ নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। অভিযানে জব্দের কথা বলা বিপুল পরিমাণ সিগারেট, মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জামের উল্লেখ মামলার নথিতে না থাকায় বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
অভিযানে দুই কোটি, মামলায় তিন লাখ
বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দৌলতপুর সদর ইউনিয়নের গড়বাড়িয়া গ্রামের হাবিব মাস্টারের গরুর খামারের ভেতরের একটি গোডাউনে অভিযান পরিচালনা করা হয়। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশের নেতৃত্বে অভিযানে থানা পুলিশের সদস্য ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযানসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গোডাউন থেকে ডার্বি, নেভি ও রয়েল ব্র্যান্ডের প্রায় ২০ লাখ শলাকা নকল সিগারেট এবং সিগারেট তৈরির বিভিন্ন উপকরণ উদ্ধার করা হয়। তখন এসব মালামালের আনুমানিক মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা বলে জানানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।
কিন্তু রাতে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর পক্ষে কাজী মর্তুজা রেজা বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারের জব্দ তালিকায় রয়েছে মাত্র ২৫ হাজার শলাকা সিগারেট ও ২৫ বস্তা তামাক। পুলিশের হিসাবে এসব মালামালের মূল্য প্রায় তিন লাখ টাকা।
১৯ লাখ ৭৫ হাজার শলাকার হিসাব কোথায়?
এখানেই সামনে এসেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অভিযানের সময় শনাক্ত ও জব্দ করা প্রায় ২০ লাখ শলাকার মধ্যে বাকি ১৯ লাখ ৭৫ হাজার শলাকার হিসাব মামলার নথিতে নেই কেন?
একইভাবে অভিযানে জব্দের কথা বলা বিভিন্ন মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জামেরও কোনো উল্লেখ নেই মামলার জব্দ তালিকায়। ফলে অভিযান, জব্দ তালিকা ও মামলার নথির মধ্যে তৈরি হওয়া এই বড় ধরনের অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আগেও অভিযান, সিলগালা—তারপরও আবার উৎপাদন!
জানা গেছে, ওই স্থানে নকল সিগারেটের বিরুদ্ধে এর আগেও অভিযান চালানো হয়েছিল। গত ৯ মে র্যাব-১২ কুষ্টিয়া ও কাস্টমস বিভাগের যৌথ অভিযানে সেখানে পাঁচটি নকল সিগারেট তৈরির মেশিন ও প্রায় এক লাখ শলাকা সিগারেট জব্দ করা হয়। পরে কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সিলগালা করার অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে আবার নকল সিগারেট উৎপাদন শুরু হয়। তাহলে প্রশ্ন উঠছে—সিলগালা করা স্থাপনা পুনরায় চালু হলো কীভাবে? আর আগের অভিযানে জব্দ করা মেশিনই বা কীভাবে আবার সেখানে ফিরে এলো?
দুই কোটি টাকার মেশিন, কিন্তু জব্দ তালিকায় নেই!
সর্বশেষ অভিযানের পর দৌলতপুর থানার ওসি খালেদুর রহমান বলেন, কারখানায় থাকা নকল সিগারেট তৈরির মেশিনটির দাম প্রায় দুই কোটি টাকা। মেশিনটি তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে সেটি জব্দ তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।
মেশিনটি কার হেফাজতে রয়েছে—এমন প্রশ্নেরও তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
অভিযানের কর্মকর্তার প্রশ্নেও রহস্য ঘনীভূত
অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, অভিযানের সময় ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই জব্দ করা মালামালের পরিমাণ ও আনুমানিক মূল্য জানানো হয়েছিল।
দুই কোটি টাকার মালামাল কীভাবে মামলায় মাত্র তিন লাখ টাকায় নেমে এলো—এ বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি মামলার বাদিই ভালো বলতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, অভিযানের পর বাদীপক্ষের এমন কর্মকাণ্ড আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করব।
বাদীর দাবি, যা জব্দ হয়েছে—তাই এজাহারে
তবে মামলার বাদী কাজী মর্তুজা রেজার বক্তব্য ভিন্ন। তার দাবি, “আমরা ওই গোডাউন থেকে যে পরিমাণ মালামাল জব্দ করেছি, সেটিই এজাহারে উল্লেখ করে মামলা করেছি।
দৌলতপুর থানার ওসি খালেদুর রহমান বলেন, বাদীর দেওয়া জব্দ করা মালামালের বিবরণের ভিত্তিতেই মামলা নেওয়া হয়েছে।
মামলায় গোডাউনের মালিক হাবিব মাস্টারকে এক নম্বর আসামি করে শাকিল আহমেদ, লোকমান হোসেন লিয়ন, সিদ্দিক মণ্ডল, সাবিনা খাতুন, জিন্নাত, ইন্নাত, ফারুক ও তাশার ইমরানসহ নয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহার নামীয় আসামিদের সবাই পলাতক বলে জানা গেছে।
গোডাউন মালিকের দাবি, ভাড়াটিয়াদের কাজ সম্পর্কে জানতেন না
গোডাউনের মালিক হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিব মাস্টারের দাবি, জয়রামপুর এলাকার শাকিল ও বৈদ্যনাথতলা এলাকার লিয়ন হোসেনের কাছে মাসিক ৪০ হাজার টাকা ভাড়ায় তিনি গোডাউনটি দিয়েছিলেন।
সেখানে নকল সিগারেট তৈরির কার্যক্রম চলছিল—এ বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না বলে দাবি করেন।
নিজেকে স্কুলশিক্ষক পরিচয় দিয়ে হাবিব মাস্টার বলেন, বিদ্যালয়ের কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি নিয়মিত গোডাউনে যেতেন না। তার দাবি, এর আগেও র্যাব ও কাস্টমসের অভিযানে স্থাপনাটি সিলগালা করা হয়েছিল এবং পরে সেটি আবার চালু হয়।
এক অভিযানে দুই হিসাব—উত্তর খুঁজছে প্রশ্ন
সব মিলিয়ে নকল সিগারেট কারখানায় অভিযানকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অভিযানে যদি প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল জব্দ হয়ে থাকে, তাহলে মামলার এজাহারে মাত্র তিন লাখ টাকার মালামাল দেখানো হলো কেন?
প্রায় ১৯ লাখ ৭৫ হাজার শলাকা সিগারেট, বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের মেশিনের হিসাব মামলার জব্দ তালিকায় না থাকার বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তার বক্তব্যেও যখন বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তখন জব্দ মালামালের প্রকৃত হিসাব, জব্দ তালিকা প্রস্তুতের প্রক্রিয়া এবং দুই কোটি টাকা থেকে তিন লাখ টাকায় মূল্য কমে যাওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই বিশাল অমিলের নেপথ্যে কী আছে—তা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
