বৃহস্পতিবার, ২০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়, নিউজ প্রকাশের পরও ‘বেপরোয়া’ হাসান শওকত

স্টাফ রিপোর্টার
আগস্ট ২০, ২০২৬ ২:০৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও বিপুল সম্পদের অভিযোগ। ফাইল ছবি

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়া, ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন গ্রহণ, কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইইডির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে প্রভাব খাটিয়ে তিনি এসব অনিয়ম করেছেন।

তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলেও বিল পরিশোধ এবং কমিশন নেওয়া। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে সুবিধাজনক পদায়ন নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এদিকে চার বছর আগে নিজ দপ্তরে বসে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগসংবলিত একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ভাইরাল ভিডিওতে টাকার বান্ডিল

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নির্বাহী প্রকৌশলী নিজ দপ্তরের চেয়ারে বসে আছেন। তার বিপরীতে কয়েকজন ঠিকাদার বসে রয়েছেন। এ সময় টেবিলের ওপর টাকার একাধিক বান্ডিল দেখা যায়।

অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারদের অফিসে ডেকে নিয়ে ঘুষের অর্থ গ্রহণের ঘটনাটি ওই ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছিল। তবে ভিডিওটির সত্যতা ও এর প্রেক্ষাপট তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হাসান শওকতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কেরামত আলীকে (উন্নয়ন) সভাপতি করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন ইইডির প্রধান প্রকৌশলী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব (উন্নয়ন-৩)।

এক সরকারের সময়ে এক পরিচয়, পরে বদলে যায় রাজনৈতিক পরিচয়!

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিয়ে ইইডিতে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন হাসান শওকত। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক পরিচয় বদলে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ, বর্তমানে তিনি বিএনপির অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পলাতক নেতাকর্মী এবং তাদের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদেরও আড়ালে সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

ইইডির একাধিক সূত্রের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠী এখনো সক্রিয়। আর এ ক্ষেত্রে হাসান শওকতের পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

১০তলা ভবনের কাজ শেষ হয়নি, বিল দেওয়া হয় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা!

হাসান শওকতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে বঙ্গভবন সংলগ্ন শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ১০তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ২০১৯ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ভবনটির নির্মাণকাজের কার্যাদেশ দেন বিল্ডার্স-সিডব্লিউবিডি জেভি নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। অভিযোগ রয়েছে, ভবনের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিপুল অঙ্কের বিল পরিশোধ করা হয়।

নথিপত্রের বরাত দিয়ে সূত্র জানায়, ২০২২ সালের জুনে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয় হাসান শওকতের স্বাক্ষরে। বিলে নবম ও দশম তলার ছাদসহ বিভিন্ন কাজের অর্থ অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে সরেজমিন পরিদর্শনের দাবি অনুযায়ী, ভবনটি তখন পর্যন্ত আটতলা পর্যন্ত নির্মিত হয়েছিল। নবম ও দশম তলার কাজ সম্পন্ন হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কাজ শেষ না হলেও কীভাবে ওই বিপুল অর্থের বিল পরিশোধ করা হলো?

এ ঘটনায় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

মোহাম্মদপুরের প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ

ঢাকার মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে বিদ্যুতের লোড বৃদ্ধি, মেরামত ও সংস্কারের জন্য প্রায় ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয় মেসার্স মেড-ইন বাংলাদেশ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।

সূত্রের অভিযোগ, ২০২২ সালে কার্যাদেশ দেওয়ার পর ২০২৩ সালে হাসান শওকতের স্বাক্ষরে প্রায় ৮ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও দীর্ঘ সময়েও কাজ সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ।

এমনকি ২০২৫ সালে বিলের অবশিষ্ট প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকাও উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কাজ না করেই বিল তোলার অভিযোগ

রাজধানীর ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ উচ্চবিদ্যালয়ে ছয়তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে হাসান শওকতের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হলেও কাজ শুরু হওয়ার আগেই হাসান শওকতের স্বাক্ষরে প্রায় ১০ লাখ টাকা বিল তোলা হয়।

এ ছাড়া ঢাকার কোতোয়ালি থানাধীন আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি প্রকল্পে কাজ না করেই প্রায় ১৯ লাখ টাকা সরকারি অর্থের বিল তোলার অভিযোগও রয়েছে।

‘টেন্ডার-বাণিজ্য’ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

ইইডির একাধিক সূত্রের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে হাসান শওকত বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন। পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে নির্ধারিত কমিশন নেওয়া এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ চাকরিজীবনে ইইডির বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এত অভিযোগের পরও এতদিন তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—কোন শক্তির ছায়ায় তিনি বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন?

কোথা থেকে এলো এত সম্পদ?

হাসান শওকতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—নিজের ও স্ত্রীর নামে দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হাতে আসা বিভিন্ন নথিতে তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, প্লট, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।

নথিপত্রের বরাত দিয়ে সূত্র জানায়, স্ত্রীর নামে বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৮৪.৩৩ শতক জমি ও রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বিলপাবলা-৫৭ মৌজায় ১২.৫০ শতাংশ, দিঘলিয়া উপজেলার বয়রা-১০ মৌজায় ১১.৭২ শতাংশ, মেহেরপুর সদর উপজেলার মেহেরপুর-৬৬ মৌজায় ১৩.৮৫ শতাংশ ও ৮ শতাংশ, মাগুরা সদর উপজেলার মাগুরা-৬৯ মৌজায় ১৯ শতাংশ জমির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মেহেরপুর সদর উপজেলার একই মৌজায় আরও ৬৫ শতাংশ এবং ৪০.৩৭ শতাংশ জমির মালিকানার তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন বরুয়া-১ মৌজাতেও জমি রয়েছে বলে অভিযোগ।

দক্ষিণখান এলাকায় নিজের ও স্ত্রীর নামে ১০তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামে-বেনামে আরও জমি, ফ্ল্যাট ও প্লট থাকার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

তবে এসব সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।

তদন্ত কমিটি, এখন নজর ফলাফলের দিকে

হাসান শওকতের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ভাইরাল ভিডিও এবং সম্পদের তথ্য সামনে আসার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। এখন প্রশ্ন—তদন্তে কী বেরিয়ে আসে এবং অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়?

অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নথিপত্রের দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।

বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…….

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।