তীব্র গরমের মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগজুড়ে বিদ্যুৎ সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনে নিয়মিত আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবচিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ফলে দিন দিন বাড়ছে গ্রাহকদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ। নগরী থেকে মফস্বল—প্রায় সর্বত্রই বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার লুকোচুরি এখন নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে।
বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার লুকোচুরি খেলা
দিন-রাত মিলিয়ে কোথাও কোথাও ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে রাতের বেলা লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিশু ও বয়স্কদের। অনেকেই ঘুমাতে পারছেন না, রাত কাটছে চরম অস্বস্তিতে।
ময়মনসিংহ নগরীর বাসিন্দা শিক্ষক রফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “দিনের বেলা তো অফিসে বা বাইরে কেটে যায়, কিন্তু রাতের বেলা এই গরম আর অন্ধকারের লুকোচুরি খেলায় জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করলেও সদুত্তর পাওয়া যায় না।
বিপর্যস্ত শিক্ষা, ব্যবসা ও স্বাস্থ্যসেবা
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ছন্দপতন
বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলছে নানা পরীক্ষা। এমন সময়ে রাতের লোডশেডিংয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও মোমবাতির আলো, কোথাও আবার জেনারেটরের বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাদের।
ব্যবসায় বাড়ছে লোকসান
বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। আইটি-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, সেলুন, বেকারি, কোল্ড স্টোরেজ এবং ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানায় উৎপাদন ও কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়ছে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়। এতে অনেক ব্যবসায়ী লোকসানের মুখে পড়ছেন।
স্বাস্থ্যসেবায় বাড়ছে দুর্ভোগ
বিদ্যুৎহীন সময়ে স্থানীয় হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতেও রোগীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছাচ্ছে। তীব্র গরমে ঘেমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন চিকিৎসাধীন রোগীরা। বিদ্যুৎ চলে গেলে চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বনাম বাস্তব চিত্র
বিদ্যুৎ বিতরণকারী কর্তৃপক্ষের দাবি, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উৎপাদন ঘাটতি এবং সঞ্চালন লাইনের বিভিন্ন ত্রুটি দূর করতে প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। খুব দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলেও আশা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।
তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—প্রতিবার গরমের মৌসুম এলেই কেন একই ধরনের সংকট ও একই অজুহাত সামনে আসে? দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সমাধানের পরিকল্পনা কোথায়?
আশ্বাস নয়, টেকসই সমাধান চান নাগরিকরা
বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, কেবল তাৎক্ষণিক আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী এই বিদ্যুৎ সংকট কাটানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পুরনো ও জরাজীর্ণ সঞ্চালন লাইন আধুনিকায়ন, গ্রিড ও উপকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুষম বিদ্যুৎ বণ্টন নিশ্চিত করা।
অন্যথায় ময়মনসিংহের সাধারণ মানুষের এই জনদুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
ময়মনসিংহের জনজীবনে বিদ্যুৎ সংকট স্থায়ী রূপ নেওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক মহলের জরুরি, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
