শনিবার, ২২শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাগেরহাটে জলে গেল ৪০ কোটি টাকা, ভেস্তে গেল সুপেয় পানির স্বপ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
আগস্ট ২১, ২০২৬ ১০:৫৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কোটি টাকার আধুনিক পানি শোধনাগার এখন অচল—মরিচা ধরছে যন্ত্রপাতিতে, চুরি হচ্ছে মূল্যবান সরঞ্জাম; পাঁচ-ছয় দিন পরপর মিলছে পানি। ফাইল ফটো

বাগেরহাট পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট দূর করতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। ভৈরব নদীর পানি পরিশোধন করে নিয়মিত পৌরবাসীর ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চালুর কয়েক মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পটি। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার বছর।

এখন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেই প্রকল্পের যন্ত্রপাতিতে ধরেছে মরিচা, নষ্ট হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এমনকি রিজার্ভারের ঢাকনা, মোটর, ফ্যানসহ বেশ কিছু মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রকল্পটি অচল পড়ে থাকায় পানির জন্য হাহাকার করছেন বাগেরহাট পৌরবাসী।

জানা গেছে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাগেরহাট পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ভৈরব নদ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে পচাঁদীঘিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পরে আধুনিক ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পানি পরিশোধন করে ওভারহেড ট্যাংকের মাধ্যমে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হয়।

২০২১ সালের জুনে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এরপর কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রকল্পটি বাগেরহাট পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু এরপর আর সচল হয়নি প্রায় ৪০ কোটি টাকার এই প্রকল্প।

কোটি টাকার স্থাপনায় এখন মরিচার ছাপ

সম্প্রতি প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিশাল ওভারহেড ট্যাংক, পাম্প হাউস ও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হতে বসেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন যন্ত্রাংশে ধরেছে মরিচা। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ছে মূল্যবান সরঞ্জাম।

অভিযোগ রয়েছে, রিজার্ভারের ঢাকনা, মোটর, ফ্যানসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। ফলে জনগণের অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো এখন কার্যত পরিত্যক্ত হওয়ার পথে।

পাঁচ-ছয় দিন পরপর পানি, তাও অল্প সময়

প্রকল্পটি বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পৌর এলাকার বাসিন্দারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় দিন পরপর পানি আসে। তাও থাকে অল্প সময়ের জন্য।

পানি আসার সময় কলসি, বালতি ও ড্রাম নিয়ে আগে থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে না পারলে রান্না, গোসল ও কাপড় ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়। নারী, শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি।

পাম্প অপারেটর মতিয়ার রহমান মল্লিক বলেন, প্রকল্পটি চালু থাকলে পৌরবাসী নিয়মিত নিরাপদ পানি পেতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

পৌর এলাকার বাসিন্দা কবির শেখ বলেন, প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নির্মাণ করা হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না তারা। বছরের পর বছর পানির সংকট নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। কখন পানি আসবে, তারও ঠিক নেই।

দূর থেকে পানি আনতে হচ্ছে

পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন, পানি না থাকায় রান্না, গোসল ও শিশুদের প্রয়োজনীয় কাজ করতেও সমস্যা হয়। অনেক সময় দূর থেকে পানি সংগ্রহ করে আনতে হয়। পৌর এলাকায় থেকেও সুপেয় পানির জন্য এভাবে কষ্ট করতে হচ্ছে। দ্রুত প্রকল্পটি চালু করে নিয়মিত পানি সরবরাহের দাবি জানান তিনি।

৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মুন্না শেখ বলেন, প্রকল্পটি চালু থাকলে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো না। এখন একদিকে পানির সংকট, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত প্রকল্পটি চালু করা দরকার।

তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

বাগেরহাট সুজনের সভাপতি এস কে হাসিব বলেন, পরিকল্পনায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, কেন এত বড় একটি প্রকল্প চালু রাখা গেল না এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও মানুষ কেন সেবা পাচ্ছেন না—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ আবু সাঈদ শুনু বলেন, এটি শুধু পানির সংকটের বিষয় নয়; সরকারি অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিরও প্রশ্ন। জনগণের অর্থে নির্মিত একটি প্রকল্প বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা দুঃখজনক। দ্রুত প্রকল্পটি চালু করে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

দায়িত্ব কার—ডিপিএইচই নাকি পৌরসভার?

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক বলেন, ঠিকাদার নির্মাণকাজ শেষ করার পর নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পটি বাগেরহাট পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরপর প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের।

বাগেরহাট পৌরসভার প্রশাসক মেজবাহ উদ্দীন বলেন, পানি সংকট নিরসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পটি পুনরায় চালু এবং পৌরবাসীর জন্য নিয়মিত সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রশ্ন এখন একটাই—প্রায় ৪০ কোটি টাকার এই প্রকল্প কি আবারও প্রাণ ফিরে পাবে, নাকি জনগণের অর্থে নির্মিত স্থাপনাগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হবে পরিত্যক্ত অবকাঠামোয়?

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।