রবিবার, ২৩শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দেশে ‘কুশ’ আনছে ত্রিদেশীয় চক্র, এক মাসে তিন চালান জব্দ, গ্রেপ্তার ২; শনাক্ত আরও ৩

স্টাফ রিপোর্টার
আগস্ট ২৩, ২০২৬ ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

একসময় দেশে প্রায় অপ্রচলিত মাদক হিসেবে পরিচিত ‘কুশ’ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। তীব্র নেশাসৃষ্টিকারী এই মাদক মূলত অভিজাত শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও এখন স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এর আসক্তির তথ্য মিলছে।

আকাশপথ ও স্থলসীমান্ত—দুই পথেই দেশে ঢুকছে কুশের চালান। এর মধ্যে থাইল্যান্ড থেকে নিয়মিত কুশ আনছে থাইল্যান্ড, ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি ত্রিদেশীয় চক্র। একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে গত এক মাসে চক্রটির তিনটি চালান জব্দ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এ পর্যন্ত চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনাক্ত করা হয়েছে আরও তিনজনকে।

ডিএনসি ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী পরিচালক ড. আবু সাঈদ মিয়া বলেন, বিশেষ জাতের গাঁজার ফুল প্রক্রিয়াজাত করে ‘কুশ’ হিসেবে বাজারজাত করা হয়। সাধারণ গাঁজার তুলনায় এর নেশার তীব্রতা অনেক বেশি। দামিও এই মাদক সাধারণ তামাকের মতো সেবনের পাশাপাশি কেক, চকলেট, চুইংগাম ও ভেপ বা ই-সিগারেটের মাধ্যমেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

থাইল্যান্ড থেকে ঢাকায়, পেছনে ত্রিদেশীয় নেটওয়ার্ক

ডিএনসির এই কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি থাইল্যান্ড, ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি চক্র কুশ দেশে নিয়ে আসছে। থাইল্যান্ডের ব্যাংকককেন্দ্রিক কিছু মাদক কারবারি এসব মাদক সরবরাহ করছে। সেখান থেকে কয়েকজন ভারতীয় নাগরিক কুশ ঢাকায় নিয়ে আসছেন। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশের চার-পাঁচজন নাগরিক।

সংশ্লিষ্টদের অনেককেই এরই মধ্যে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনার আশা করছে ডিএনসি।

এক মাসে তিন চালান, চক্রের নেটওয়ার্কে টান

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সর্বশেষ শনিবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হোসেন আবদুল কাদের শেখ নামে এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে জব্দ করা হয় ৩ কেজি কুশ।

জানা গেছে, কলকাতা থেকে ব্যাংকক হয়ে ঢাকায় আসেন তিনি। ভারতের মুম্বাইয়ে তার ‘সোহেল ট্যুরস ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি পোশাক ব্যবসার সঙ্গেও তিনি জড়িত। প্রায়ই থাইল্যান্ড ও চীনে যাতায়াত করতেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি কুশের দাম প্রায় ২০ লাখ টাকা।

এর আগে ১৮ আগস্ট শাহজালাল বিমানবন্দরে ৪ কেজি ১০০ গ্রাম কুশ জব্দ করা হয়। ওই চালানটি আনেন ভারতীয় নাগরিক আকাশ দুবে ও আকাশ পান্ডে। তবে চালান জব্দের প্রক্রিয়া আঁচ করতে পেরে তারা বিমানবন্দর থেকে পালিয়ে যান। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, তারা এখনও বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।

এ চক্রের আরেক সদস্য জুলফিকার মোল্লাকে গত ২৪ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে জব্দ করা হয় ১১ কেজি ৮০০ গ্রাম কুশ।

বিমানকর্মী থেকে মাদক কারবারে

ডিএনসির এক কর্মকর্তা জানান, জুলফিকার মোল্লা কলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বিমানবন্দরে একটি বিমান প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। চাকরি চলে যাওয়ার পর ব্যাংক ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনে ভাড়ায় চালাতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন।

শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া পাঁচ লাখ রুপি এবং ঋণ নেওয়া দুই লাখ রুপি নিয়ে ব্যাংকক যান জুলফিকার। সেখান থেকে প্রায় সাত লাখ রুপির সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে কুশের চালান কিনে ঢাকায় নিয়ে আসেন। চালানটি বাংলাদেশের সহযোগীদের হাতে পৌঁছে দিতে পারলে তার দুই লাখ টাকা লাভ হওয়ার কথা ছিল।

ডিএনসি কর্মকর্তারা আরও জানান, এর আগে জুন মাসেও জুলফিকার ঢাকায় একটি চালান এনেছিলেন। তবে সেই চালান জব্দ করা সম্ভব হয়নি।

জুলফিকারের সহযোগী হিসেবে তার চাচাতো ভাই আকরাম মোল্লার নামও এসেছে। কলকাতায় তার ডেকোরেটর ব্যবসা রয়েছে।

ভারতীয় বাহক, বাংলাদেশি সহযোগী

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, তিনটি চালানের সঙ্গে পাঁচ ভারতীয় নাগরিকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশে চার-পাঁচজন রয়েছেন বলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

তদন্তকারীদের মতে, ভারতীয় নাগরিকরা ঢাকায় এসে চালান হস্তান্তর করে ফিরে যান। এরপর দেশের ভেতরে কুশ ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশি সহযোগীরা।

শুধু চালান গ্রহণ নয়, বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে থাকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে গ্রেপ্তারের পর আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও স্থানীয় সহযোগীরা করে থাকেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

জুলফিকারের জামিনের জন্য চার-পাঁচজন আইনজীবী তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। কারাগারে যাওয়ার পরদিনই একজন ব্যক্তি তার জন্য জামাকাপড়সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তিদের শনাক্তে কাজ চলছে।

সীমান্তেও কুশের চালান

এর আগে গত ৬ আগস্ট সাতক্ষীরা সীমান্ত থেকে ১২ কেজি কুশসহ মো. তারিকুজ্জামান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে বিজিবি। সে সময় বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, চালানটি ভারতে নেওয়া হচ্ছিল।

অর্থাৎ আকাশপথের পাশাপাশি সীমান্তপথেও কুশের অবৈধ চলাচলের তথ্য সামনে এসেছে।

স্কুলছাত্রও কুশের নেশায়, কিনে দেন চিকিৎসক মা

কুশের বিস্তার শুধু বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বলে জানিয়েছেন ডিএনসি কর্মকর্তারা। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ কুশে আসক্ত হয়ে পড়ছে বলেও তারা তথ্য পেয়েছেন।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালাতে গিয়ে এমন তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এরই মধ্যে গত ২৬ মে শাহজালাল বিমানবন্দরে এক নারী চিকিৎসক ও তার ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। তাদের কাছ থেকে ৫৯টি ইলেকট্রিক ভেপ জব্দ করা হয়। এসব ভেপের মধ্যে কুশের মূল উপাদান টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (টিএইচসি) ছিল।

জিজ্ঞাসাবাদে ওই চিকিৎসক জানান, ছেলে ভেপ চেয়েছিল। তাই তাকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে সেগুলো কিনে দেন তিনি। শিশুটির বাবাও একজন চিকিৎসক বলে জানা গেছে।

এবার দেশেই উৎপাদনের চেষ্টা

শুধু বিদেশ থেকে কুশ আমদানি নয়, দেশে বসেই এটি উৎপাদনের চেষ্টার তথ্যও পেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনেক দেশে কুশ বা গাঁজার চাষ নিষিদ্ধ হওয়ায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে এর উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগের সন্ধান মিলেছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার ওয়ারীতে কুশ উৎপাদন ও সংরক্ষণের একটি পূর্ণাঙ্গ ল্যাবরেটরি শনাক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী তৌসিফ হাসান বিদেশে থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে সহযোগীদের মাধ্যমে নিজের বাসায় কুশ উৎপাদনের ল্যাব তৈরি করেন।

এরও আগে ২০২২ সালের আগস্টে দেশে প্রথমবার কুশ জব্দের কথা জানিয়েছিল র‍্যাব। তখন বলা হয়েছিল, ওনাইসী সাঈদ ওরফে রেয়ার সাঈদ নামে এক ব্যক্তি বিদেশ থেকে ফিরে মাদক নিয়ে গবেষণা করছিলেন। কুশ, হেম্প, মলি ও ফেন্টানলের মতো মাদকের চাষ এবং বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করার উদ্দেশ্যে তিনি একটি ল্যাবরেটরি তৈরি করেছিলেন বলে সে সময় জানানো হয়।

বাড়ছে উদ্বেগ

বিদেশ থেকে চোরাইপথে কুশের চালান আসা, সীমান্তে জব্দ, দেশীয় সহযোগীদের মাধ্যমে এর বিস্তার এবং সবশেষে দেশে উৎপাদনের চেষ্টার তথ্য—সব মিলিয়ে নতুন ধরনের মাদকঝুঁকি সামনে আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের মধ্যে কুশের প্রবেশ ঠেকাতে সরবরাহকারী চক্রের পাশাপাশি এর দেশীয় নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন মাদক নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্টরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।